দিল্লি – সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে ভারতের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির সবচেয়ে স্পষ্ট উদাহরণ মিলেছে ২০২৫ সালে—এমনই দাবি করলেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। শুক্রবার নয়াদিল্লিতে আয়োজিত ‘অ্যান্টি-টেররিজ়ম কনফারেন্স–২০২৫’-এ ভাষণ দিতে গিয়ে তিনি বলেন, এই প্রথমবার সন্ত্রাসবাদী হামলার পরিকল্পনাকারী ও হামলা কার্যকরকারী—দু’পক্ষকেই আলাদা, লক্ষ্যভিত্তিক অভিযানে শাস্তি দিয়েছে ভারত।
অমিত শাহের বক্তব্য অনুযায়ী, অপারেশন সিঁদুর এবং অপারেশন মহাদেবের মাধ্যমে পাকিস্তানের জঙ্গি মদতদাতাদের কড়া বার্তা দেওয়া হয়েছে। তাঁর কথায়, ‘২২ এপ্রিল পহেলগামে যে সন্ত্রাসবাদী হামলার পরিকল্পনা করা হয়েছিল, তার জবাব দেওয়া হয়েছে অপারেশন সিঁদুরের মাধ্যমে। আর যারা সেই হামলা কার্যকর করেছিল, তাদের সম্পূর্ণভাবে নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে অপারেশন মহাদেবের মাধ্যমে।’
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দাবি করেন, এই ঘটনাই প্রথম যেখানে সন্ত্রাসবাদী হামলার পরিকল্পনাকারীদের পাশাপাশি হামলাকারীদেরও আলাদা করে নিশানা করা হয়েছে। পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন—উভয় স্তরেই ভারত সরকার, নিরাপত্তা বাহিনী এবং দেশের মানুষ একযোগে পাকিস্তানের জঙ্গি মদতদাতাদের যোগ্য জবাব দিয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
অপারেশন সিঁদুরের আওতায় মে মাসে ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনী পাকিস্তান ও পাক-অধিকৃত কাশ্মীরে থাকা একাধিক জঙ্গি শিবিরে নিখুঁত হামলা চালায়। এই অভিযান চালানো হয় জম্মু ও কাশ্মীরের পহেলগামে ভয়াবহ জঙ্গি হামলার কয়েক দিনের মধ্যেই, যেখানে ২৬ জনের মৃত্যু হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে জুলাই মাসে অপারেশন মহাদেব চালিয়ে ওই হামলায় সরাসরি জড়িত জঙ্গিদের নিকেশ করা হয়।
পহেলগামের বৈসরন ভ্যালিতে হওয়া এই হামলা গোটা দেশকে নাড়িয়ে দিয়েছিল বলে মন্তব্য করেন অমিত শাহ। তাঁর মতে, এই হামলার মূল উদ্দেশ্য ছিল কাশ্মীরে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট করা এবং উন্নয়ন ও পর্যটনের নতুন অধ্যায়কে ব্যাহত করা। তিনি জানান, অত্যন্ত নির্ভুল গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে তিন জন জঙ্গিকেই নিকেশ করা হয়েছে এবং পহেলগাম হামলার তদন্ত সম্পূর্ণ হয়েছে। এই তদন্তের ফল আন্তর্জাতিক মঞ্চে পাকিস্তানকে কাঠগড়ায় দাঁড় করাবে বলেও দাবি করেন তিনি।
সন্ত্রাসবাদের বদলে যাওয়া চরিত্র নিয়েও সতর্ক করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। প্রযুক্তির ব্যবহারে সন্ত্রাসের রূপ দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে বলে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ভারতকে সব সময় অন্তত দু’ধাপ এগিয়ে থাকতে হবে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি শক্তিশালী ও অভেদ্য সন্ত্রাসবিরোধী গ্রিড গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন তিনি।
সমন্বয় ও কার্যকর প্রতিরোধের জন্য দেশজুড়ে এক ছাঁচে অ্যান্টি-টেররিজ়ম স্কোয়াড বা ATS কাঠামোর পক্ষে জোরালো সওয়াল করেন অমিত শাহ। তাঁর মতে, অপারেশনাল ইউনিফর্মিটি না থাকলে সঠিকভাবে হুমকি মূল্যায়ন বা পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব নয়। রাজ্যগুলির ডিজিপিদের দ্রুত এই কাঠামো কার্যকর করার আহ্বান জানান তিনি এবং NIDAAN ও NATGRID-এর মতো প্ল্যাটফর্ম নিয়মিত ব্যবহারের উপর জোর দেন।
গত মাসে দিল্লির লালকেল্লার কাছে বিস্ফোরণের ঘটনার তদন্তে জম্মু ও কাশ্মীর পুলিশ এবং কেন্দ্রীয় সংস্থাগুলির ভূমিকার প্রশংসাও করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। পহেলগাম হামলা ও দিল্লি বিস্ফোরণের তদন্তকে তিনি ‘ওয়াটারটাইট’ তদন্তের উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেন।
সম্মেলনে অমিত শাহ এনআইএ-র আপডেটেড ক্রাইম ম্যানুয়াল প্রকাশ করেন। পাশাপাশি অস্ত্র সংক্রান্ত একটি ই-ডাটাবেস এবং সংগঠিত অপরাধচক্রের ডাটাবেসেরও উদ্বোধন করেন তিনি। তাঁর বক্তব্য, সংগঠিত অপরাধ অনেক সময় সন্ত্রাসের অর্থের জোগান দেয়, বিশেষত যখন অপরাধচক্রের মাথারা বিদেশে পালিয়ে গিয়ে জঙ্গি সংগঠনের সঙ্গে যোগসূত্র গড়ে তোলে।
জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নে কেন্দ্র ও রাজ্যকে একসঙ্গে ‘টিম ইন্ডিয়া’ হিসেবে কাজ করার আহ্বান জানিয়ে অমিত শাহ বলেন, ‘নিড টু নো’ সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে ‘ডিউটি টু শেয়ার’ মানসিকতা গড়ে তুলতে হবে। ভারত যত এগোবে, চ্যালেঞ্জ তত বাড়বে—এই বাস্তবতায় একটি শক্তিশালী ও সমন্বিত সন্ত্রাসবিরোধী কাঠামো গড়ে তোলাই দেশের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব বলে মন্তব্য করেন তিনি।




















