মালদা- ‘আমের স্বর্গ’ নামে পরিচিত মালদহ জেলাতেই মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে এক ভয়ংকর মাদকচক্র। উত্তরবঙ্গের এই জেলায় রাস্তায় পুলিশের নজর এড়াতে স্কুলপড়ুয়া শিশু-কিশোরদের ব্যবহার করে চালানো হচ্ছে মাদক পাচার। অভিযোগ, স্কুলব্যাগের ভিতরে বই-খাতার ফাঁকে লুকিয়ে বিপুল পরিমাণ মাদক এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। সিনেমার গল্পের মতো শোনালেও বাস্তবে এই চক্রে জড়িয়ে পড়ছে বহু কিশোর ভবিষ্যৎ।
সম্প্রতি ইংরেজবাজারের কুমারপুর এলাকায় তল্লাশি চালিয়ে পুলিশ উদ্ধার করেছে প্রায় ১৭ কোটি টাকার ব্রাউন সুগার। ছোট্ট গ্রাম্য এলাকায় এত বড় মাদক কারখানার অস্তিত্ব সামনে আসতেই চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে। পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, উত্তর-পূর্ব ভারতের বিভিন্ন রাজ্য—অসম, মণিপুর, মেঘালয়, মিজোরাম ও নাগাল্যান্ড—থেকে গোপনে কাঁচামাল আনা হত। এরপর মালদহেই তৈরি হত বিভিন্ন নেশাদ্রব্য, যা পূর্ব ভারতের একাধিক জেলায় ছড়িয়ে পড়ত।
তদন্তে এই চক্রের মূল মাথা হিসেবে উঠে এসেছে এনারুল শেখের নাম। গত জানুয়ারিতে কলকাতার এন্টালি এলাকা থেকে তাঁকে গ্রেফতার করা হয়। অভিযোগ, বছরের পর বছর ধরে এই ব্যবসা চালিয়ে হাজার হাজার কোটি টাকার মুনাফা তুলেছে তাঁর নেটওয়ার্ক। তাঁকে জেরা করেই সম্প্রতি আরও কয়েকজনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ, যাদের মধ্যে গোয়া থেকেও ধরা পড়া সদস্য রয়েছে।
জেলার পুলিশ সুপার অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায় জানিয়েছেন, একের পর এক পাচারকারীকে গ্রেফতার করা হচ্ছে। বড় চালানের পাশাপাশি স্থানীয় এলাকায় ছোট প্যাকেটে ‘পুরিয়া’ বিক্রিও জোরকদমে চলছে। তদন্তকারীদের দাবি, এই চক্র অত্যন্ত সংগঠিত এবং বহু স্তরে বিস্তৃত।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হল, ১২ থেকে ১৪ বছরের নাবালক স্কুলছাত্রদের পাচারের কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে। বইয়ের মাঝেই লুকিয়ে রাখা হচ্ছে মাদকের প্যাকেট। এমনকি সদ্য মা হওয়া মহিলাদেরও বেবি ফুডের আড়ালে কেরিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। বিনিময়ে কখনও নগদ অর্থ, আবার অনেক ক্ষেত্রে নেশার লোভ দেখিয়ে টেনে আনা হচ্ছে তাদের। পাচারের বিনিময়ে ‘পুরস্কার’ হিসেবে দেওয়া হচ্ছে সেই মাদকই।
এক উদ্ধার হওয়া নাবালক জানিয়েছে, তাদের টাকা দেওয়া হত না, বরং মাদক খাইয়ে কাজে লাগানো হত। ফলে একদিকে নষ্ট হচ্ছে শিশুর ভবিষ্যৎ, অন্যদিকে বিপদের মুখে পড়ছে পরিবার ও সমাজ। এখন তদন্তকারীদের সামনে বড় প্রশ্ন—এত বড় এই মাদকচক্রের শিকড় কোথায় এবং কীভাবে এত দ্রুত বিস্তার লাভ করল।




















