ওজন কমানোর চিকিৎসায় যুগান্তকারী পরিবর্তন, FDA অনুমোদন পেল ওয়েগোভি পিল

ওজন কমানোর চিকিৎসায় যুগান্তকারী পরিবর্তন, FDA অনুমোদন পেল ওয়েগোভি পিল

Facebook
Twitter
LinkedIn
Email
WhatsApp
Print
Telegram


বিদেশ – মঙ্গলে উষা। ওজন কমানোর চিকিৎসায় এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হল। এই প্রথমবার ওজন কমানোর জন্য ট্যাবলেট আকারে GLP-1 শ্রেণির একটি ওষুধকে অনুমোদন দিল আমেরিকার ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন বা FDA। ডেনমার্কের ওষুধ প্রস্তুতকারী সংস্থা নোভো নরডিস্কের জনপ্রিয় ওজন কমানোর ওষুধ ওয়েগোভি এবার ইনজেকশনের পাশাপাশি পিল হিসেবেও বাজারে আসতে চলেছে। এতদিন এই ধরনের শক্তিশালী ওষুধ সপ্তাহে একবার ইনজেকশন হিসেবেই নিতে হত, ফলে এই সিদ্ধান্তকে স্থূলতা চিকিৎসার ক্ষেত্রে যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।
নতুন এই ট্যাবলেট সংস্করণেও রয়েছে একই সক্রিয় উপাদান সেমাগ্লুটাইড, যা ওয়েগোভি ইনজেকশন ও ডায়াবেটিসের ওষুধ ওজেম্পিকেও ব্যবহৃত হয়। সেমাগ্লুটাইড শরীরের GLP-1 হরমোনের মতো কাজ করে, যা ক্ষুধা কমায়, দীর্ঘক্ষণ পেট ভরা থাকার অনুভূতি তৈরি করে এবং ধীরে ধীরে ওজন কমাতে সাহায্য করে। নোভো নরডিস্কের দাবি, দিনে একবার খাওয়ার এই পিল ওজন কমানোর ক্ষেত্রে ইনজেকশনের মতোই কার্যকর।
সংস্থার প্রকাশিত ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের তথ্য অনুযায়ী, এই পিল ব্যবহারকারীদের উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ওজন কমেছে এবং দীর্ঘমেয়াদে তার প্রভাব বজায় থেকেছে। নোভো নরডিস্কের মার্কিন মেডিক্যাল প্রধান ডা. জেসন ব্রেট জানিয়েছেন, অনেক রোগীই ইনজেকশন নিতে অনীহা প্রকাশ করেন। তাঁদের জন্য এই ট্যাবলেট একটি বড় সুযোগ তৈরি করল এবং এর ফলে চিকিৎসার পরিসর আরও বিস্তৃত হবে। ইতিমধ্যেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি আট জন প্রাপ্তবয়স্কের মধ্যে একজন কোনও না কোনও GLP-1 ওষুধ ব্যবহার করছেন বলে স্বাস্থ্য গবেষণা সংস্থা KFF-এর দাবি।
দামের দিক থেকেও এই ওষুধ ঘিরে আগ্রহ তুঙ্গে। জানুয়ারি ২০২৬ থেকে মার্কিন বাজারে প্রেসক্রিপশনের মাধ্যমে ওয়েগোভি পিল পাওয়া যাবে। নিজ খরচে কিনলে শুরুর ডোজের দাম ১৪৯ ডলার, যা ভারতীয় মুদ্রায় প্রায় ১৩ হাজার টাকার কিছু বেশি। ডোজ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দামও বাড়বে, যদিও চূড়ান্ত মূল্য এখনও জানানো হয়নি। বিমা যাঁদের রয়েছে এবং যাঁদের বিমা সংস্থা এই ওষুধের খরচ কভার করবে, তাঁদের ক্ষেত্রে কো-পে তুলনামূলকভাবে কম হতে পারে। এই মূল্য কাঠামো নিয়ে নোভো নরডিস্কের সঙ্গে ট্রাম্প প্রশাসনের একটি চুক্তিও হয়েছে।
পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার দিক থেকে ইনজেকশনের সঙ্গে খুব বেশি পার্থক্য নেই এই পিলের। ট্রায়ালে দেখা গেছে, বমি বমি ভাব, বমি, পেটের অস্বস্তির মতো গ্যাস্ট্রোইনটেস্টাইনাল সমস্যা দেখা দিতে পারে। প্রায় সাত শতাংশ রোগী পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার কারণে ওষুধ বন্ধ করেছেন, যা প্লাসিবো গ্রুপের সংখ্যার কাছাকাছি।
তবে খাওয়ার নিয়মে রয়েছে কড়াকড়ি। এই পিল অল্প জল দিয়ে খালি পেটে খেতে হবে এবং ওষুধ খাওয়ার পর অন্তত ৩০ মিনিট পর্যন্ত কিছু খাওয়া, পান করা বা অন্য কোনও ওষুধ নেওয়া যাবে না। এই নিয়মের কারণেই আগে ডায়াবেটিসের পিল রাইবেলসাস খুব বেশি জনপ্রিয় হয়নি বলে চিকিৎসকদের একাংশ মনে করছেন।
এর মধ্যেই ওজন কমানোর ওষুধের বাজারে প্রতিযোগিতা আরও বাড়ছে। নোভো নরডিস্কের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী এলি লিলি তাদের খাওয়ার GLP-1 ওষুধ অরফরগ্লিপ্রন আগামী গ্রীষ্মে FDA অনুমোদন পেতে পারে বলে আশা করছে। লিলির দাবি, তাদের পিল যে কোনও সময়, খাবার বা জল ছাড়াই নেওয়া যাবে, যা রোগীদের কাছে আরও সুবিধাজনক হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধরনের ওষুধের উপকারিতা শুধু ওজন কমানোতেই সীমাবদ্ধ নয়। কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের এন্ডোক্রিনোলজিস্ট ডা. জুডিথ কর্নারের মতে, কার্যকারিতা, নিরাপত্তা ও খরচ—এই তিনটি দিক বিচার করেই চূড়ান্ত মূল্যায়ন করতে হবে। তবে তিনি এটাও স্বীকার করেছেন যে, এই ওষুধগুলির মাধ্যমে হৃদরোগের ঝুঁকি কমে, স্লিপ অ্যাপনিয়া নিয়ন্ত্রণে আসে, লিভারের কার্যক্ষমতা উন্নত হয় এবং হার্ট ফেলিওরের আশঙ্কাও কমতে পারে।
সব মিলিয়ে, ট্যাবলেট আকারে ওয়েগোভির বাজারে আসা ওজন কমানোর চিকিৎসায় এক নতুন দিগন্ত খুলে দিল। আগামী দিনে এই ধরনের ওষুধ স্থূলতা চিকিৎসার চেহারাই বদলে দিতে পারে বলে মনে করছেন চিকিৎসক ও গবেষকরা।

RECOMMENDED FOR YOU.....

Scroll to Top