
কোচবিহার :- ২০১৯-র লোকসভা ভোটে বাংলাকে এবার পাখির চোখ করেছে বিজেপি। এর আগে ৩ এপ্রিল পশ্চিমবঙ্গে জোড়া সভা করে গিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। আজ ফের উত্তরবঙ্গে দ্বিতীয়বার নির্বাচনী প্রচারে হাজির প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী৷ কোচবিহারে এবার প্রচার ঝড় তুলতে আসলেন নরেন্দ্র মোদী৷ রাসমেলার মাঠে জনসভা করলেন তিনি৷রবিবার জনসভায় সারদা-নারদা-রোজভ্যালি নিয়ে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীকে তীব্র আক্রমণ করেন তিনি। তিনি বলেন, সারদা-নারদা-রোজভ্যালিতে সব টাকা লুঠেছে। এক-এক টাকার হিসেব নেবে এই চৌকিদার। কেন সপ্তম বেতন কমিশনের সুপারিশ লাগু হচ্ছে না সে নিয়েও প্রশ্ন তোলেন মোদী। বাংলায় যুবকদের চাকরি হচ্ছে না বলে অভিযোগ করেন তিনি। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে কটাক্ষ করে তিনি বলেন, পশ্চিমবঙ্গের ‘স্পিড ব্রেকার দিদি’ রাতে ঘুমোতে পারছেন না। মা, মাটি, মানুষ মুখে বললেও দিদি এই সব শব্দের আসল মাহাত্ম্য মনে রাখেন নি৷ উল্টে এই শব্দের অপমান করেছেন৷’’ রবিবার কোচবিহার লোকসভা কেন্দ্রের প্রার্থী নিশীথ প্রামাণিকের সমর্থনে নির্বাচনী জনসভা এসে এমনি কটাক্ষ করলেন নরেন্দ্র মোদী৷ এদিন রাসমেলা মাঠে মোদীর সভা ঘিরে ছিল মানুষের বেশ উন্মাদনা৷ আর সেই সভাতেই মোদী দাবি করেন, দেশকে টুকরো কার পথে যারা এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে তাদের সঙ্গে হাত মিলিয়েছেন তৃণমূল নেত্রী৷ অনুপ্রবেশকারীদের সুবিধা করে দেওয়া হচ্ছে৷ গণতন্ত্রে হিংসার বাতাবরণ কায়েম করেছে মমতার সরকার৷এদিন ওই সভায় মোদী বলেন,‘‘দেশকে যারা টুকরো করতে চাইছে দিদি তাদের পক্ষে রয়েছেন৷ ফলে পরিষ্কার তৃণমূল মা’কে ভুলে গিয়েছে রাজনৈতিক স্বার্থে৷ অনুপ্রবেশকারীদের মদত দিচ্ছে মমতা সরকার৷ দিদির এই পদক্ষেপ মানুষ’কে অপমানের সামিল৷ গত বেশ কয়েকটি ভোটে রাজ্যে হিংসার ঘটনা ঘটেছে৷ যা মানুষের ক্ষতি করেছে৷কাশ্মীরের জন্য পৃথক প্রধানমন্ত্রী এবং রাষ্ট্রপতির দাবি জানিয়ে নয়া বিতর্কের জন্ম দিয়েছেন ন্যাশনাল কনফারেন্স নেতা ওমর আবদুল্লা৷ এইদিন জম্মু-কাশ্মীরের এই দাবি নিয়েও কোচবিহারে সরব ছিলেন নরেন্দ্র মোদী৷ এনসির বিরোধী জোটে থাকায় ‘পৃথক প্রধানমন্ত্রী এবং রাষ্ট্রপতি’র দাবি নিয়েও তৃণমূল নেত্রীর সমালোচনা করেন প্রধানমন্ত্রী৷ বলেন, ‘‘যারা এই ধরণের দাবি করছে দিদি তাদের সঙ্গে হাত মিলিয়েছে৷ যার পরিণতি ভয়ঙ্কর৷’’লোকসভার বৈতরণী পারে বাংলাকে পাখির চোখ করেছে বিজেপি৷ গেরুয়া শিবিরের প্রচারেও তৃণমূল সরকারের অনুন্নয়নের থেকে বেশি প্রাধান্য পাচ্ছে হিংসা, অনুপ্রবেশ ইস্যু, এয়ারস্ট্রাইক নিয়ে বিরোধীদের প্রশ্ন তোলার বিষয়গুলি৷ এবার জোড়াফুল শিবিরকে বেকায়দায় ফেলতে এই নানান ইস্যুর সঙ্গে তৃণমূলের স্লোগানকে সংযুক্ত করে রাজ্যের শাসক দলকে বিঁধলেন প্রধানমন্ত্রী৷বিজেপির পোস্টার বয় মোদী এদিন কোচবিহারের সভায় ‘বুয়া ভাতিজা’ জোট বলেও রাজ্যের শাসক দলের সমালোচনা করেন৷ মোদী বলেন,‘‘পিসি-ভাইপো জোড়ি রাজ্যকে অনুপ্রবেশকারীদের স্বর্গরাজ্যে পরিণত করেছে৷’’ প্রধানমন্ত্রীর কথায় বাংলার সমস্যার অন্যতম কারণ অনুপ্রবেশ৷ ক্ষমতায় এলে অনুপ্রবেশকারীদের রেহাই মিলবে না বলে এদিন ফের হুঁশিয়ারি দেন তিনি৷বিরোধী জোটের অন্যতম মুখ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়৷ মোদীকে ক্ষমতা চ্যূত করতে মরিয়া তিনি৷ তৃণমূল সুপ্রিমোর মুখে প্রায়ই শোনা যায়, ‘‘মোদী হঠাও দেশ বাঁচাও৷’’ যাকে কটাক্ষ করে মোদীর জবাব, ‘‘বিজেপির প্রতি মানুষের সমর্থন বাড়ছে৷ যা দিদির রাগের কারণ৷ দিদি নির্বাচন কমিশনের উপর রাগ দেখাচ্ছে৷ আয়নায় নিজের ভবিষ্যৎ দেখতে পাচ্ছেন উনি৷ তাই এত সহজে মোদীকে হঠানো যাবে না৷ আগামী ১১ এপ্রিল প্রথম দফার ভোট। সেই দিন ভোট রয়েছে রাজ্যের কোচবিহার ও আলিপুরদুয়ার লোকসভা কেন্দ্রে। রাজ্যের এই দুই কেন্দ্রের নির্বাচনকে কেন্দ্র করে জোর কদমে প্রচার শুরু করেছে সমস্থ রাজনৈতিক দল। শেষ দিকে প্রচারকে তুঙ্গে নিয়ে যেতে প্রধান দুই প্রতিদ্বন্দ্বী দল তৃণমূল কংগ্রেস ও বিজেপি হাইপ্রোফাইল সভা করার উদ্যোগ নিয়েছে। ৭ এপ্রিল কোচবিহার রাসমেলা মাঠে সভা করলেন প্রধান মন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। আর তার পরের দিন অর্থাৎ ৮ এপ্রিল ওই মাঠেই সভা করবেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।রবিবার কোচবিহারের সভা মঞ্চ থেকে চাকরি থেকে, ভোট ব্যাংকের রাজনীতি, হিংসা থেকে উন্নয়নে বাধা, তৃণমূল কংগ্রেসকে একের পর এক ইস্যু নিয়ে কড়া ভাষায় আক্রমণ করেন মোদী৷ পাশাপাশি কোচবিহারের জনগণকে তৃণমূল সরকারকে উৎখাত করে বাংলা তথা দিল্লিতে বিজেপিকে সমর্থনের জন্য আহ্বান জানান তিনি৷রাসমেলার মাঠ থেকে বক্তব্য পেশ করতে গিয়ে মমতার সরকারকে বিঁধতে গিয়ে তুলে আনলেন ত্রিপুরায় বামেদের শাসনের কথাও৷ মোদী বলেন, ত্রিপুরাতে অরাজকতা চালিয়েছে বামফ্রন্ট৷ রাজ্যেও একই কাজ করে চলেছেন দিদি৷ ত্রিপুরার মানুষ দীর্ঘদিন ধরে তা সহ্য করেছে৷ তারা পরিবর্তন চেয়েছিল মনে মনে, আর তার জন্য মুখ বুজে অপেক্ষাও করেছে৷ আর যখনই সেই সময় এসেছে তারা বদলে দিয়েছে পরিস্থিতি৷ তাঁরা ত্রিপুরার দায়িত্ব দিয়েছে গেরুয়া শিবিরকে৷ আমরা ত্রিপুরায় বামেদের মডেল গ্রহণ করিনি৷ জোর দিয়েছি উন্নয়নের ওপর৷ ত্রিপুরায় বামেদের এই মডেলই এবার এই রাজ্যে অনুসরণ করছেন দিদি৷ সারদা-নারদায় রাজ্যকে জর্জরিত করেছেন৷ দেশের ভালোর জন্য এনআরসি-সিটিজিনেশিপ অ্যামেন্ডমেন্ট বিল নিয়ে এসেছে বিজেপি৷ কিন্তু দিদি সেখানেও স্পিডব্রেকারের কাজ করছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।এদিন তিনি আরও বলেন, “২০২২-এর মধ্যে প্রত্যেকের কাছে নিজেদের পাকা বাড়ি হোক, এটা আমার স্বপ্ন৷ এর জন্য পশ্চিমবঙ্গে ইতিমধ্যে ১৩ লক্ষ বাড়ি তৈরী করেছে এই চৌকিদার। কিন্তু দিদি সেই কাজে স্পিডব্রেকার হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে৷ আর তাই অনেকেই এই সুবিধা থেকে বঞ্চিত৷ তাই দিদিকে উচিত শিক্ষা দিতে পশ্চিমবঙ্গে পদ্ম বেশি সংখ্যায় ফোটাতে হবে৷ দিল্লিতে আপনাদের আওয়াজ পৌঁছতে এই কাজ করতে হবে৷ দিদিকে আপনাদের ভালোর জন্য মাথা নোওয়াতেই হবে৷এদিন ওই সভা মঞ্চ থেকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে কটাক্ষ করে বলেন, “দিদির আসল চেহারা বিশ্বের সামনে নিয়ে আসা জরুরি৷ কিন্তু দিদি রাজ্যের সংসস্কৃত, গৌরব, নাগরিকদের জীবন ধ্বংস করার চেষ্টায়৷ কেন রাজ্যে সপ্তম বেতন কমিশন লাগু হচ্ছে না, তার কারণ কী দিদি বলেছে আপনাদের ? কেন পরীক্ষায় পাশ করেও চাকরি পাচ্ছে না যুবক-যুবতীরা ? কেন চা-বাগানে সমস্যা ? এসবের উত্তর কী দিদি দিয়েছে? রাসমেলা মাঠে তৃণমূলের বাঁধা রয়েছে মঞ্চ৷ সেই মঞ্চ ঘিরে তৈরি হয় বিতর্ক৷ সোমবার ওই মঞ্চেই নির্বাচনী প্রচার সভা করবেন তৃণমূল সুপ্রিমো৷ ঠিক তার আগের দিন তৃণমূলের ওই মঞ্চের পাশে মঞ্চ গড়ে সভা করেন নরেন্দ্র মোদী। এদিন তিনি বক্তব্য দিতে উঠেই ওই মঞ্চ দেখিয়ে বলেন,‘‘ওটা দিদির পরাজয়ের স্মারক, বিনাসের জীবন্ত স্মারক। ওই মঞ্চ বানিয়েছে যাতে জায়গা ছোট হয়ে যায়। কিন্তু এইভাবে মানুষের উন্মাদনা কমানো যাবে না৷ সভাস্থলে এত মানুষের ভিড়ই বলে দিচ্ছে বাংলায় বিজেপির সমর্থন বাড়ছে৷প্রধানমন্ত্রীর কথায়, এইসব ঘটনাই প্রমাণ করছে দিদি ভীত৷ তাই কথায় কথায় রেগে যাচ্ছেন দিদি৷ কিন্তু মানুষ পদ্মফুলকে সমর্থন করলে কারোর কিছু করার নেই৷ মোদীর দাবি, ‘‘দিদি ভীত৷ বিজেপির জন সমর্থনে উনি আয়নায় নিজের ভবিষ্যৎ দেখতে পেয়েছেন৷ তাই শিশু সূলভ আচরণ করে আমাকে আটকানোর চেষ্টা করছেন৷এদিন জন সভায় প্রধানমন্ত্রী বলেন,‘‘দেশকে যারা টুকরো করতে চাইছে তাদের সমর্থন করছেন দিদি৷ তিনি তাদের সমর্থন করেছেন যারা দেশে দুটো প্রধানমন্ত্রী চান৷ একজন কাশ্মীরের প্রধানমন্ত্রী হবেন৷ অপরজন কাশ্মীর বাদে গোটা দেশের প্রধানমন্ত্রী হবেন৷’’ জনতার উদ্দেশে প্রশ্ন ছুঁড়ে তিনি জানতে চান, কেন্দ্রে এমন সরকার চান আপনারা ? এমন দাবিকে আপনারা সমর্থন করবেন ? মমতা-অভিষেককে ‘বুয়া-ভাতিজা’ জুটি বলে কটাক্ষ করেন মোদী৷ বলেন, ‘‘এই বুয়া ভাতিজা জুটি রাজ্যকে ধ্বংস করে দেবে৷লোকসভার বৈতরণী পারে বাংলাকে পাখির চোখ করেছে বিজেপি৷ গেরুয়া শিবিরের প্রচারেও তৃণমূল সরকারের অনুন্নয়নের থেকে বেশি প্রাধান্য পাচ্ছে হিংসা, অনুপ্রবেশ ইস্যু, এয়ারস্ট্রাইক নিয়ে বিরোধীদের প্রশ্ন তোলার বিষয়গুলি৷ এবার জোড়াফুল শিবিরকে বেকায়দায় ফেলতে এই নানান ইস্যুর সঙ্গে তৃণমূলের স্লোগানকে সংযুক্ত করে রাজ্যের শাসক দলকে বিঁধলেন প্রধানমন্ত্রী৷কোচবিহারের রাসমেলার মাঠে পরপর দু’দিন সভা মোদী মমতা’র৷ প্রধানমন্ত্রীর সভার ২৪ ঘন্টার মধ্যেই মোদীর অভিযোগদের জবাব দেবেন মুখ্যমন্ত্রী৷ ৩০ মিটারের ব্যবধানে মঞ্চ রয়েছে অর্ধ বাঁধা অবস্থায়৷ যা নিয়ে বিজেপি ও তৃণমূলের মধ্যে তরজা শুরু হয়৷ পরে অবশ্য বিবাদের অবসান হয়৷ ঠিক হয় মোদীর সভাস্থল থেকে মমতার সভা মঞ্চ বাদ দিয়ে বাকি কাঠামো খুলে নিতে হবে। শুধু রয়ে যাবে পরদিন সভার জন্য প্রস্তুত হওয়া মমতার মঞ্চটি। আগামী কাল সোমবার মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নরেন্দ্র মোদীর এই কটাক্ষের জবাব দেয় কি না সেটাই এখন দেখায় বিষয়।



















