রাজ্য – বাংলার রাজনীতির ময়দানে এখন ‘ভাণ্ডার’ যুদ্ধের দামামা। একদিকে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়-এর তুরুপের তাস ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার’, অন্যদিকে সেই জমি পুনরুদ্ধারের লক্ষ্য নিয়ে ভারতীয় জনতা পার্টি-র নবতম বাজি ‘অন্নপূর্ণা ভাণ্ডার’। কিন্তু এই ভাণ্ডার-রাজনীতির আড়ালে লুকিয়ে থাকা স্ববিরোধিতা এখন স্পষ্ট হয়ে উঠেছে পূর্ব বর্ধমানের ভাতারের দেওয়ালে দেওয়ালে। কোথাও মাসে ৩ হাজার টাকার প্রতিশ্রুতি, আবার পাশের বুথেই স্লোগান— ‘ভাতা নয়, চাকরি চাই’। এই দ্বিমুখী বার্তায় সাধারণ মানুষও প্রশ্ন তুলছেন, বিজেপির আসল অবস্থান ঠিক কী?
ভাতার-এর ১৯৩ নম্বর পার্টের দেওয়ালে বড় অক্ষরে লেখা, ‘অন্নপূর্ণা ভাণ্ডার প্রতি মাসে ৩ হাজার টাকা, ১ জুন হইতে।’ স্থানীয় বিজেপি নেতৃত্বের দাবি, ক্ষমতায় এলে ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার’-এর নাম বদলে ‘অন্নপূর্ণা’ করে অর্থের পরিমাণ বাড়ানো হবে। অথচ ঠিক পাশের ১৯৪ নম্বর বুথের দেওয়ালে একই দলের কর্মীরাই লিখছেন, ‘ভাতা নয়, চাকরি চাই। পাল্টানো দরকার, চাই বিজেপি সরকার।’ এই বৈপরীত্য কি কেবল নির্বাচনী কৌশল, নাকি আদর্শগত বিভ্রান্তি— সেই প্রশ্ন উঠছে স্বাভাবিকভাবেই।
দলের মুখপাত্রদের যুক্তি, ভাতা ও চাকরির দাবির মধ্যে কোনও বিরোধ নেই। তাঁদের বক্তব্য, বর্তমান আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটে ভাতা প্রয়োজনীয় হলেও তা স্থায়ী সমাধান নয়। বিজেপির দাবি, বর্তমান সরকার মাসে ১৫০০ টাকা দিচ্ছে, যা প্রয়োজনের তুলনায় কম। তাই তাঁরা মাসে ৩০০০ টাকার প্রস্তাব দিচ্ছেন। তবে একই সঙ্গে তাঁদের অবস্থান, ভাতাকে ‘সাময়িক মলম’ হিসেবে দেখা উচিত— চূড়ান্ত লক্ষ্য হওয়া উচিত কর্মসংস্থান ও আত্মনির্ভরতা।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, সরাসরি ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার’-এর বিরোধিতা করার ঝুঁকি নিতে চাইছে না বিজেপি। কারণ বাংলার নারী ভোটব্যাঙ্কে এই প্রকল্পের প্রভাব যথেষ্ট। তাই নাম বদলে বাড়তি অঙ্কের প্রতিশ্রুতি দিয়ে প্রতিযোগিতায় নামার কৌশল নেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে তৃণমূলের দাবি, বিজেপি বাংলার মডেল নকল করে ভোটের আগে প্রতিশ্রুতি দেয়, কিন্তু ক্ষমতায় এলে তা রক্ষা করে না। তাঁদের বক্তব্য, মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যে প্রতিশ্রুতি দেন, তা বাস্তবায়ন করেন— এই বিশ্বাসই তাঁদের শক্তি।
ভোটমুখী বাংলায় তাই প্রশ্ন একটাই— বাড়তি ভাতার প্রতিশ্রুতি কি বিজেপিকে নারীদের মন জয় করতে সাহায্য করবে, নাকি ‘ভাতা বনাম চাকরি’ এই দ্বিমুখী প্রচার তাঁদের বিশ্বাসযোগ্যতাকেই প্রশ্নের মুখে ফেলবে? দেওয়ালে লেখা ৩ হাজার টাকার ‘অন্নপূর্ণা ভাণ্ডার’ আদৌ বাস্তবায়িত হবে, না কি তা নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিতেই সীমাবদ্ধ থাকবে— তার উত্তর মিলবে ভোটের ফল প্রকাশের পরেই। আপাতত, এই দ্বৈত বার্তার রাজনীতি বাংলার ভোটারদের মনে এক বড় ধাঁধা হয়ে রয়ে গেছে।




















