ভোটের অঙ্কে ‘যুবসাথী’, লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের ছায়াতেই যুব ভোট ধরার কৌশল

ভোটের অঙ্কে ‘যুবসাথী’, লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের ছায়াতেই যুব ভোট ধরার কৌশল

Facebook
Twitter
LinkedIn
Email
WhatsApp
Print
Telegram


রাজ্য – ভোটের আগে বাংলার বাজেট মানেই কেবল টাকার হিসাব নয়, বরং রাজনীতির সূক্ষ্ম অঙ্ক। কে কত টাকা পেল, তার থেকেও গুরুত্বপূর্ণ—কোন ভোটব্যাঙ্ককে ছোঁয়া হল আর কাকে ছোঁয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। সদ্য ঘোষিত ‘বাংলার যুবসাথী’ প্রকল্পকে সেই দৃষ্টিতেই দেখছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকেরা। তাঁদের মতে, এটি নিছক একটি ভাতা প্রকল্প নয়, বরং লক্ষ্মীর ভাণ্ডার-নির্ভর জনমুখী রাজনীতির মধ্যেই নতুন করে যুব ভোটব্যাঙ্ককে যুক্ত করার কৌশল।
রাজ্য বাজেট অনুযায়ী, পশ্চিমবঙ্গের মাধ্যমিক পাশ করা ২১ থেকে ৪০ বছর বয়সি যুবক-যুবতীরা দিনপ্রতি ৫০ টাকা, অর্থাৎ মাসে ১,৫০০ টাকা করে ভাতা পাবেন। ২০২৬ সালের ১৫ অগস্ট থেকে কার্যকর হবে এই প্রকল্প। সর্বোচ্চ পাঁচ বছর পর্যন্ত এই সুবিধা মিলবে, তবে তার আগেই চাকরি পেলে ভাতা বন্ধ হয়ে যাবে। সরকারি ভাষায় এটি বেকার যুবসমাজের জন্য সাময়িক সহায়তা, আর রাজনৈতিক ভাষায় অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মধ্যে এক ধরনের আশ্বাস।
এই জায়গাতেই তুলনা উঠে আসছে রাজ্যের সবচেয়ে জনপ্রিয় প্রকল্প লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের সঙ্গে। ২৫ থেকে ৬০ বছর বয়সি মহিলাদের জন্য এই প্রকল্পে সাধারণ শ্রেণিভুক্তরা মাসে ১,০০০ টাকা এবং তফসিলি জাতি ও জনজাতিভুক্তরা ১,২০০ টাকা করে পান। অর্থাৎ বছরে ১২ হাজার থেকে ১৪ হাজার ৪০০ টাকা। সদ্য ঘোষিত বাজেটে এই ভাতা আরও ৫০০ টাকা বাড়ানোর কথাও বলা হয়েছে। শর্ত কঠোর হলেও সামাজিক ও রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতার দিক থেকে লক্ষ্মীর ভাণ্ডার এখন প্রশ্নাতীত। তার উপর মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ইঙ্গিত দিয়েছেন, ভবিষ্যতে এই প্রকল্প আজীবনের পথে এগোতে পারে।
এই প্রেক্ষিতেই প্রশ্ন উঠছে, যুবতীরা কোন দিকে ঝুঁকবেন? একদিকে ২১ বছর থেকেই যুবসাথীতে মাসে ১,৫০০ টাকা, অন্যদিকে ২৫ বছরের পর লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের দীর্ঘমেয়াদি নিশ্চয়তা। আপাতভাবে দ্বন্দ্ব মনে হলেও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই দুটি প্রকল্প আসলে পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, বরং পরিপূরক।
হিসেবটা বেশ পরিষ্কার। ২১ বছর বয়সে যে যুবতী যুবসাথীর জন্য আবেদন করবেন, তিনি জানেন এই ভাতা পাঁচ বছরের বেশি নয়। অর্থাৎ ২৬ বছর বয়সে প্রকল্পের মেয়াদ শেষ। এরপরই লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের দরজা খুলে যায়। সেই অর্থে যুবসাথী হয়ে উঠছে এক ধরনের ‘ট্রানজিট স্কিম’। সহজ ভাষায়, কন্যাশ্রী থেকে লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের মাঝের ফাঁকটা পূরণ করার ব্যবস্থা।
তবে বাস্তব চিত্র এতটা সরল নয়। অনেকেই ভাবতে পারেন, এত কাগজপত্র, বয়সসীমা ও শর্ত মানার ঝামেলা না করে সরাসরি লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের জন্য আবেদন করাই সুবিধাজনক। বিশেষ করে যাঁদের বয়স ২৫ ছুঁইছুঁই, তাঁদের কাছে যুবসাথীর আকর্ষণ কম হতে পারে। ফলে এই প্রকল্প সর্বজনগ্রাহ্য না হয়ে নির্দিষ্ট বয়সসীমার যুবসমাজেই সীমাবদ্ধ থাকার সম্ভাবনাও রয়েছে।
তবু প্রশ্ন থেকেই যায়—এই সীমাবদ্ধতা জানা সত্ত্বেও কেন যুবসাথী? এখানেই রাজনীতির আসল চাল। এতদিন রাজ্যের জনমুখী প্রকল্প মানেই মূলত নারী-কেন্দ্রিক উদ্যোগ—কন্যাশ্রী, রূপশ্রী, লক্ষ্মীর ভাণ্ডার। তার সুফল ভোটবাক্সে মিলেছেও। কিন্তু ভোটমুখী বাজেটে পুরুষ বা যুব ভোটব্যাঙ্ক পুরোপুরি উপেক্ষা করা ঝুঁকির। যুবসাথী প্রকল্প সেই শূন্যস্থানেই আঘাত করেছে। নামকরণই তার প্রমাণ—‘যুবসাথী’, অর্থাৎ যুবসমাজের পাশে থাকার বার্তা।
অর্থনৈতিক দৃষ্টিতে দিনপ্রতি ৫০ টাকা কোনও স্থায়ী সমাধান নয়, কর্মসংস্থানের বিকল্পও নয়। কিন্তু রাজনৈতিক দৃষ্টিতে এটি একটি স্পষ্ট বার্তা—রাজ্য সরকার অন্তত বেকার যুবকদের কথা ভাবছে, তাদের হাতে কিছু তুলে দিতে চাইছে। ভোটের অঙ্কে এই স্বীকৃতির মূল্য অনেক সময় টাকার অঙ্কের থেকেও বেশি।
সব মিলিয়ে বলা যায়, যুবসাথী প্রকল্প লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, বরং তারই বিস্তৃত ছায়া। একদিকে নারী ভোটব্যাঙ্কের অটুট বন্ধন, অন্যদিকে যুব ভোটে ঢিল ছোড়া—এই দুইয়ের সমন্বয়েই তৈরি হচ্ছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভোটমুখী সামাজিক প্রকল্পের রাজনীতি।

RECOMMENDED FOR YOU.....

Scroll to Top