ভোটের বাইরে বাঁচার লড়াই: সুন্দরবন-এর জঙ্গলে প্রতিদিনই ‘আসল নির্বাচন’

ভোটের বাইরে বাঁচার লড়াই: সুন্দরবন-এর জঙ্গলে প্রতিদিনই ‘আসল নির্বাচন’

Facebook
Twitter
LinkedIn
Email
WhatsApp
Print
Telegram


দক্ষিন 24 পরগণা – রাজ্যজুড়ে যখন ভোটের উত্তাপ তুঙ্গে, রাজনৈতিক মঞ্চে প্রতিশ্রুতির ঝড় বইছে, তখন সুন্দরবন-এর প্রান্তিক গ্রাম গুড়গুড়িয়ায় ছবিটা একেবারেই আলাদা। এখানে ভোটের আলোচনা ম্লান, সামনে উঠে আসে বেঁচে থাকার কঠিন বাস্তব। পেটের তাগিদে প্রতিদিন প্রাণ হাতে নিয়ে গভীর জঙ্গলে মধু সংগ্রহে নামছেন পুরুষদের পাশাপাশি মহিলারাও।
ভোর হতেই দল বেঁধে নদীপথ পেরিয়ে অরণ্যের দিকে রওনা দেন তাঁরা। সংসারের দায় কাঁধে তুলে নিতে সদ্য বিবাহিত পুত্রবধূদেরও নামতে হচ্ছে এই বিপজ্জনক পেশায়। এখানে বাঁচতে হলে কাজ করতেই হবে—বাড়িতে বসে থাকার কোনও সুযোগ নেই। জীবিকার তাগিদই তাঁদের ঠেলে দিচ্ছে মৃত্যুঝুঁকির মুখে।
এই অঞ্চলে মধু সংগ্রহ শুধু পেশা নয়, একপ্রকার জীবন-মরণ খেলা। জলে কুমিরের আতঙ্ক, ডাঙায় রয়েল বেঙ্গল টাইগারের ভয়—সবকিছুকে উপেক্ষা করেই গাছের উঁচু ডালে ঝুলে থাকা মৌচাক ভেঙে মধু সংগ্রহ করতে হয়। পুরুষরা গাছে ওঠেন, আর নিচে দাঁড়িয়ে পাহারা দেন মহিলারা, যেন হঠাৎ কোনও বিপদ এলে মোকাবিলা করা যায়।
মৌমাছি তাড়াতে খড় জ্বালিয়ে ধোঁয়া তৈরি করা হয়, সেই আড়ালেই চলে মধু সংগ্রহ। কিন্তু সামান্য ভুলও ডেকে আনতে পারে বড় বিপদ—মৌমাছির হুল, গাছ থেকে পড়ে যাওয়া, কিংবা হিংস্র প্রাণীর হঠাৎ আক্রমণ। প্রতিটি মুহূর্তেই থাকে মৃত্যুর আশঙ্কা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, জঙ্গলে প্রবেশের জন্য প্রয়োজনীয় বৈধ পাস অনেক ক্ষেত্রেই মেলে না। ফলে বাধ্য হয়ে লুকিয়ে-চুরিয়ে জঙ্গলে ঢুকতে হয় তাঁদের। এতে ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়। এক স্থানীয় মহিলার কথায়, “নতুন বউকেও সঙ্গে নিয়ে যেতে হয়, না হলে সংসার চলবে কীভাবে?” এই সমস্যার প্রতিবাদে বহুবার রাস্তায় নেমে আন্দোলনও করেছেন তাঁরা, কিন্তু অভিযোগ—প্রশাসনের তরফে এখনও তেমন কার্যকর পদক্ষেপ দেখা যায়নি।
বিকল্প জীবিকার সুযোগ প্রায় নেই বললেই চলে, নিরাপত্তা ব্যবস্থাও অপ্রতুল। ফলে প্রতিদিনই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে জঙ্গলে যেতে বাধ্য হচ্ছেন এই মানুষগুলো। দিন শেষে হাতে আসে সামান্য কিছু মধু, যা বিক্রি করে কোনওরকমে চলে সংসার। কিন্তু সেই আয়ের পেছনে লুকিয়ে থাকে ভয়, অনিশ্চয়তা আর মৃত্যুর ছায়া।
ভোট আসবে, যাবে, হয়তো সরকারও বদলাবে। কিন্তু সুন্দরবন-এর এই প্রান্তিক মানুষের জীবনযুদ্ধ কতটা বদলাবে, সেই প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। কারণ এখানে প্রতিদিনই চলছে বেঁচে থাকার আসল নির্বাচন।

RECOMMENDED FOR YOU.....

Scroll to Top