রাজ্য – মেসির কলকাতা সফরে যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনে ঘটে যাওয়া বিশৃঙ্খলা নিয়ে এবার প্রকাশ্যে মুখ খুললেন তৃণমূল কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। মঙ্গলবার দিল্লিতে সংসদের বাইরে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে তিনি প্রশ্ন তোলেন, ঘটনার এক ঘণ্টার মধ্যেই মুখ্যমন্ত্রী প্রকাশ্যে ক্ষমা চেয়েছেন এবং সংশ্লিষ্ট সকলের বিরুদ্ধে কড়া পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। তা সত্ত্বেও কেন বারবার রাজ্যকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হচ্ছে, সেই প্রশ্নই তুলেছেন তিনি।
যুবভারতীর ঘটনার প্রসঙ্গে অভিষেক বলেন, মুখ্যমন্ত্রী নিজে মানুষের কাছে ক্ষমা চেয়েছেন, পুলিশকর্তা থেকে শুরু করে মন্ত্রী—সবার বিরুদ্ধেই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তাঁর কথায়, এটাই দায়িত্বশীল প্রশাসনের পরিচয়। একটি ঘটনা ঘটার পর রাজ্যের তরফে যা যা করণীয় ছিল, সবই করা হয়েছে। এরপরও কেন বিষয়টিকে রাজনৈতিকভাবে টেনে আনা হচ্ছে, তা নিয়ে তিনি বিস্ময় প্রকাশ করেন।
একই সঙ্গে বিজেপিকে কটাক্ষ করে অভিষেক প্রশ্ন তোলেন, কুম্ভ মেলায় যখন বহু মানুষের মৃত্যু হয়, তখন কেন প্রধানমন্ত্রী বা যোগী আদিত্যনাথকে কেউ প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায় না। তখন তদন্ত বা ক্ষমা চাওয়ার দাবি ওঠে না কেন, সেই তুলনাও টানেন তিনি।
এদিন MGNREGA প্রকল্পের বকেয়া টাকা নিয়ে কেন্দ্রের বিরুদ্ধে ফের সরব হন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি বলেন, এই প্রকল্প নিয়ে তৃণমূলের লড়াই সকলের জানা। হাইকোর্টের নির্দেশ সত্ত্বেও কেন্দ্র সুপ্রিম কোর্টে এসএলপি দাখিল করেছিল, যা খারিজ হয়ে গিয়েছে। তবুও মানুষের প্রাপ্য টাকা আটকে রাখা হচ্ছে। মানুষের স্বার্থে সংসদে এই লড়াই চলবে বলেও স্পষ্ট করেন তিনি।
ভোটার তালিকা সংশোধন বা SIR নিয়েও নির্বাচন কমিশনের কড়া সমালোচনা করেন অভিষেক। তাঁর অভিযোগ, পশ্চিমবঙ্গে এই প্রক্রিয়া অত্যন্ত অপরিকল্পিতভাবে চালানো হচ্ছে। তিনি বলেন, এই কাজ দুই বছরে করা যেত, অথচ তা দুই মাসে করতে গিয়ে বহু বিএলও-র উপর অমানবিক চাপ পড়েছে, এমনকি অনেকে মারা গিয়েছেন বলেও দাবি করেন তিনি। প্রকাশিত খসড়া তালিকায় হুগলির ডানকুনি ১৮ নম্বর ওয়ার্ডের এক জীবিত কাউন্সিলরকে ‘মৃত’ দেখানো হয়েছে বলেও অভিযোগ তোলেন তিনি।
নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন বা CAA নিয়ে বিজেপির বিরুদ্ধে সমাজ বিভাজনের রাজনীতির অভিযোগ আনেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি বলেন, আইন তৈরির নিয়মাবলী করতে বিজেপির পাঁচ বছর লাগল কেন, ২০১৯ থেকে এখন পর্যন্ত কতজনকে নাগরিকত্ব দেওয়া হয়েছে—এই প্রশ্নের উত্তর বিজেপিকে দিতে হবে। আসামে NRC-র সময় কত মানুষ বাদ পড়েছিলেন এবং তাঁদের বর্তমান অবস্থান কী, সেই প্রশ্নও তোলেন তিনি।
ভোটার তালিকা সংশোধন হোক বা FIR—সব ক্ষেত্রেই তৃণমূলের ভোট শতাংশ ও আসন বাড়বে বলে বিজেপিকে চ্যালেঞ্জ করেন অভিষেক। তাঁর বক্তব্য, যদি তৃণমূলের ভোট শেয়ার বাড়ে, তবে বিজেপিকে আটকে রাখা দুই লক্ষ কোটি টাকা ছাড়তে হবে এবং বাংলার মানুষের কাছে ক্ষমা চাইতে হবে। বিজেপি এই চ্যালেঞ্জ নিতে ভয় পাচ্ছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
রাজ্যপালের মন্তব্য প্রসঙ্গে প্রশ্ন করা হলে অভিষেক স্পষ্ট বলেন, রাজ্যপাল একটি মনোনীত পদে আছেন, তাঁর জবাব দেওয়ার জন্য তিনি সংসদে নির্বাচিত হননি।
প্রসঙ্গত, গত ১৩ ডিসেম্বর আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপজয়ী তারকা লিওনেল মেসির কলকাতা সফরের সময় যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনে চরম বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। বহু দর্শক মেসিকে কাছ থেকে দেখতে না পেয়ে ক্ষোভে ফেটে পড়েন। গ্যালারি থেকে বোতল ছোড়া হয়, ব্যানার ভাঙচুর করা হয় এবং ব্যারিকেড ভেঙে মাঠে নেমে পড়ে উন্মত্ত জনতা। ঘটনার পর ক্রীড়ামন্ত্রী অরূপ বিশ্বাস পদত্যাগ করেন এবং মুখ্যমন্ত্রী প্রকাশ্যে ক্ষমা চেয়ে অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি অসীমকুমার রায়ের নেতৃত্বে তদন্ত কমিটি গঠন করেন।
প্রাথমিক তদন্ত রিপোর্টের ভিত্তিতে রাজ্য সরকার একাধিক শাস্তিমূলক পদক্ষেপ নিয়েছে। রাজ্য পুলিশের ডিজি রাজীব কুমারকে শোকজ করা হয়েছে। পাশাপাশি বিধাননগরের কমিশনার মুকেশ কুমার, যুবকল্যাণ ও ক্রীড়া দপ্তরের সচিব রাজেশ কুমার সিনহাকেও শোকজ করা হয়েছে। বিধাননগরের ডিসি অনীশ সরকারকে সাসপেন্ড করা হয়েছে এবং যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনের সিইও দেবকুমার নন্দনকে বরখাস্ত করা হয়েছে। এই সমস্ত পদক্ষেপের কথাই তুলে ধরে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় দাবি করেন, রাজ্য সরকার দায়িত্বশীলতার সঙ্গে সব প্রয়োজনীয় কাজ করেছে, এর পরে আর প্রশ্ন তোলার কোনও অবকাশ নেই।




















