বিদেশ – মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্ভাব্য বাণিজ্য চুক্তির শর্ত হিসাবে ভারত রাশিয়া থেকে জ্বালানি তেল কিনতে পারবে না—এমন দাবি সংবাদমাধ্যমের একাংশে প্রকাশিত হলেও সেই খবরে কোনও সত্যতা নেই বলে বিভিন্ন সূত্রে জানানো হয়েছে। বাস্তবে রাশিয়া হোক বা অন্য কোনও দেশ, কোথা থেকে তেল আমদানি করা হবে সে বিষয়ে ভারতের সরকারকে কারও কাছ থেকে অনুমতি নিতে হয় না। জ্বালানি আমদানির সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণভাবেই ভারতের নিজস্ব নীতি ও প্রয়োজনের উপর নির্ভর করে।
বর্তমানে ভারত সরকারের অধীনস্থ তেল সংস্থাগুলি দেশের মোট চাহিদার ৮৫ শতাংশেরও বেশি অপরিশোধিত তেল আমদানি করে। ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর ইউরোপীয় দেশগুলির নিষেধাজ্ঞার ফলে রাশিয়ার তেলের দাম তুলনামূলকভাবে কমে যায়, যা ভারতের জন্য একটি নতুন সুযোগ তৈরি করে। কম দামে তেল কেনার সুযোগ কাজে লাগিয়ে ভারত রাশিয়া থেকে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি আমদানি শুরু করে। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়াই ছিল ভারতের বৃহত্তম অপরিশোধিত তেল সরবরাহকারী দেশ। ভারতীয় তেল সংস্থাগুলি প্রতিদিন প্রায় ১ থেকে ১.৭ মিলিয়ন ব্যারেল রাশিয়ান অপরিশোধিত তেল আমদানি করেছে, যা ভারতের মোট তেল আমদানির প্রায় ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ। গড়ে মাসে প্রায় ২৮ থেকে ৪৮ মিলিয়ন ব্যারেল রাশিয়ান তেল ভারতে এসেছে এবং প্রতিদিন অন্তত ১০ লক্ষ ব্যারেল রাশিয়ান তেল ক্রয় করা হচ্ছে।
বাজার বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি সত্যিই রাশিয়া থেকে তেল কেনার জন্য ভারতের আমেরিকার অনুমতির প্রয়োজন হতো, তাহলে এত বিপুল পরিমাণ তেল আমদানি করা সম্ভব হতো না। সম্প্রতি ইরানকে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা বৃদ্ধি পাওয়ার পর জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষক আশঙ্কা করেছিলেন যে ভারত তেল সরবরাহ নিয়ে সমস্যায় পড়তে পারে। সেই প্রেক্ষাপটেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ সচিব স্কট বেসেন্ট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘এক্স’-এ একটি পোস্ট করেন। সেখানে তিনি জানান, ভারত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অংশীদার এবং বৈশ্বিক তেল সরবরাহ বজায় রাখতে ভারতীয় তেল শোধনাগারগুলিকে রাশিয়ার অপরিশোধিত তেল কেনার জন্য ৩০ দিনের বিশেষ ছাড় দেওয়া হয়েছে।
এরপর মার্কিন অর্থ দফতরের অফিস অফ ফরেন অ্যাসেটস কন্ট্রোল (OFAC) এক বিবৃতিতে জানায়, ২০২৬ সালের ৫ মার্চ পর্যন্ত যেসব জাহাজে রাশিয়ার তেল বা পেট্রোলিয়ামজাত পণ্য লোড করা হয়েছে, সেগুলি ভারতকে সরবরাহ করার অনুমতি থাকবে। এই ছাড় কার্যকর থাকবে ৩ এপ্রিল ২০২৬ পর্যন্ত। মার্কিন প্রশাসনের দাবি, মধ্যপ্রাচ্যে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার ফলে বিশ্ব জ্বালানি বাজারে যে চাপ তৈরি হয়েছে তা সামাল দিতেই এই সাময়িক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
তবে ভারতের অবস্থান স্পষ্ট। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই মোদি সরকার বারবার জানিয়েছে, দেশের ১৪০ কোটি মানুষের স্বার্থই তাদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সাধারণ মানুষের উপর জ্বালানির খরচের চাপ কমাতে যেখান থেকে কম দামে তেল পাওয়া যাবে, সেখান থেকেই তা কেনা হবে। কোন দেশ থেকে জ্বালানি আমদানি করা হবে, সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার পূর্ণ অধিকার ভারতের নিজেরই রয়েছে বলে সরকার আগেই স্পষ্ট করেছে।



















