দিল্লি – গুজরাট হাইকোর্ট অঙ্গনওয়াড়ি কর্মী (AWWs) ও অঙ্গনওয়াড়ি সহায়িকা (AWHs)-দের জন্য এক ঐতিহাসিক রায় প্রদান করেছে, যা প্রায় এক লক্ষ কর্মীর আর্থিক ও সামাজিক মর্যাদায় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনবে। আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী, অঙ্গনওয়াড়ি কর্মীদের ন্যূনতম মাসিক ভাতা ২৪,৮০০ টাকা এবং সহায়িকাদের জন্য ২০,৩০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এতদিন কর্মীরা যেখানে ১০,০০০ টাকা এবং সহায়িকারা ৫,৫০০ টাকা করে পেতেন, সেখানে নতুন নির্দেশ কার্যকর হলে তাদের জীবনে উল্লেখযোগ্য উন্নতি ঘটবে।
বিচারপতি এ. এস. সুপেহিয়া এবং আর. টি. বচহানি সমন্বয়ে গঠিত ডিভিশন বেঞ্চ স্পষ্ট জানিয়েছেন, অঙ্গনওয়াড়ি কর্মী ও সহায়িকারা শুধু “ন্যূনতম মজুরি” নন, বরং “লিভিং ওয়েজ” বা জীবনধারণের জন্য প্রয়োজনীয় পারিশ্রমিক পাওয়ার অধিকারী। আদালতের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, এই কর্মীরা গর্ভবতী মহিলা ও স্তন্যদানকারী মায়েদের স্বাস্থ্যসেবা, শিশুদের পুষ্টি এবং প্রাথমিক শিক্ষার মতো গুরুদায়িত্ব পালন করেন। অথচ অপ্রতুল ভাতার কারণে তারা নিজেরাই সম্মানজনক জীবনযাপনে বঞ্চিত হচ্ছিলেন। তাই ভারতীয় সংবিধানের ২১ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, যা মৌলিক অধিকার হিসেবে জীবন ও মর্যাদার সুরক্ষা দেয়, নতুন ভাতা কার্যকর করা হবে ২০২৫ সালের ১ এপ্রিল থেকে। এছাড়াও, আদালত নির্দেশ দিয়েছে যে মজুরির বকেয়া অংশও পরবর্তীতে পরিশোধ করতে হবে।
এর আগে, ২০২৪ সালের ২ আগস্ট হাইকোর্টের একক বেঞ্চ একটি রায়ে জানিয়েছিল যে, অঙ্গনওয়াড়ি কর্মী ও সহায়িকাদের বেতন সরকারি স্থায়ী কর্মচারীদের সমান ধরা হোক এবং তাদের চাকরি নিয়মিতকরণের জন্য নীতি প্রণয়ন করা হোক। সেই রায় অনুযায়ী তিন বছর আগের তারিখ থেকে বকেয়া বেতন প্রদানের কথাও বলা হয়েছিল। তবে বর্তমান ডিভিশন বেঞ্চ জানিয়েছে, একক বেঞ্চের সেই সিদ্ধান্ত রাজ্যের ওপর বিশাল আর্থিক চাপ সৃষ্টি করবে। তাই পূর্ববর্তী রায় খারিজ করে নতুন নির্দেশ জারি করা হয়েছে।
আদালত আরও জানিয়েছে, এই ন্যূনতম মজুরি প্রদানের দায়িত্ব এককভাবে রাজ্য সরকারের অথবা কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের যৌথভাবে বহন করতে হবে। একইসঙ্গে এই নির্দেশ কেবলমাত্র আদালতে মামলা করা কর্মীদের জন্য সীমাবদ্ধ নয়, বরং গোটা গুজরাট রাজ্যের সমস্ত অঙ্গনওয়াড়ি কর্মী ও সহায়িকার ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য হবে। অর্থাৎ অন্য কর্মীদের আর আলাদাভাবে আদালতে আবেদন করার প্রয়োজন হবে না।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে গুজরাটে প্রায় এক লক্ষ অঙ্গনওয়াড়ি কর্মী ও সহায়িকা কাজ করছেন। ফলে নতুন নির্দেশ কার্যকর হলে সরকারের আর্থিক বোঝা নিঃসন্দেহে বাড়বে। তবে আদালতের মতে, এই ধরনের সামাজিক দায়বদ্ধতা পূরণ করা সরকারের অন্যতম দায়িত্ব। আদালত “সমান কাজের জন্য সমান মজুরি” প্রসঙ্গে স্পষ্ট করেছে যে, অঙ্গনওয়াড়ি কর্মী ও সহায়িকার কাজকে সরাসরি সরকারি শ্রেণি-তৃতীয় বা শ্রেণি-চতুর্থ কর্মীদের কাজের সঙ্গে তুলনা করা যায় না, কারণ তাদের যোগ্যতা, নিয়োগের প্রক্রিয়া এবং কাজের প্রকৃতি আলাদা। তবুও তাদের কাজের গুরুত্ব বিবেচনা করে জীবিকা নির্বাহের উপযুক্ত মজুরি নির্ধারণ করা হয়েছে।
অঙ্গনওয়াড়ি কর্মী ও সহায়িকারা দীর্ঘদিন ধরেই দাবি করে আসছিলেন যে, তাদের প্রদত্ত সম্মানী অপমানজনক এবং ভারতীয় সংবিধানের ১৪, ১৬, ২১ ও ২৩ নম্বর অনুচ্ছেদের পরিপন্থী। তারা চাকরির নিয়মিতকরণ এবং সরকারি কর্মচারীর মর্যাদার দাবিও জানিয়েছিলেন। যদিও সর্বশেষ রায়ে তাদের সব দাবি পূরণ না হলেও আর্থিক মর্যাদা বৃদ্ধির পথে এই রায় একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
গুজরাট হাইকোর্টের এই সিদ্ধান্ত শুধু রাজ্যের অঙ্গনওয়াড়ি কর্মী ও সহায়িকাদের জন্য নয়, দেশের অন্যান্য রাজ্যের ক্ষেত্রেও দৃষ্টান্ত তৈরি করতে পারে। কারণ, অঙ্গনওয়াড়ি কর্মীরা দেশের শিশু ও মহিলাদের স্বাস্থ্য, পুষ্টি এবং শিক্ষার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তাদের শ্রমের সঠিক মূল্যায়ন ও মর্যাদা নিশ্চিত করা ছিল ন্যায়বিচারের প্রয়োজনীয় দাবি, যা এই রায়ের মাধ্যমে বাস্তবায়নের পথে এগোল।




















