রাজ্য – প্রসূতি মায়েদের মৃত্যুহার বাড়ায় উদ্বেগে রাজ্য স্বাস্থ্য দপ্তর। মৃত্যুর হার নিয়ন্ত্রণে আনতে কঠোর নির্দেশিকা জারি করা হয়েছে। মেদিনীপুর মেডিকেল কলেজে প্রসূতি মৃত্যুর ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাজ্যজুড়ে স্যালাইনের ব্যবহার নিয়ে কড়া গাইডলাইন প্রকাশ করেছে স্বাস্থ্য দপ্তর। শহরের মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে শুরু করে গ্রামীণ হাসপাতাল পর্যন্ত প্রতিটি স্তরে প্রসূতি মায়েদের স্যালাইন দেওয়ার ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞ কমিটির তৈরি প্রোটোকল যথাযথভাবে মানা হচ্ছে কিনা, তা কঠোরভাবে খতিয়ে দেখা হবে। নতুন বিজ্ঞপ্তি জারি হওয়ায় চিকিৎসা ব্যবস্থার গুণগত মান নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
রাজ্যের সরকারি মেডিকেল কলেজ, গ্রামীণ হাসপাতাল, ব্লক স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও ডেলিভারি পয়েন্ট—প্রতিটি জায়গাতেই চিকিৎসক, অ্যানেস্থেসিওলজিস্ট ও নার্সদের বাধ্যতামূলকভাবে নতুন ফ্লুইড গাইডলাইন মেনে চলতে হবে। এই গাইডলাইনে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, সিজারের সময় ও অস্ত্রোপচারের পর রক্তক্ষরণ বন্ধ করতে স্যালাইন ব্যবহারের ক্ষেত্রে চিকিৎসকদের অতিসতর্ক থাকতে হবে। সঠিক মাত্রায়, সঠিক সময়ে স্যালাইন প্রয়োগ না হলে প্রাণঘাতী জটিলতা দেখা দিতে পারে। ভুল মাত্রায় স্যালাইন দিলে বিপদের আশঙ্কা বাড়ে। নির্দেশিকায় সতর্ক করে বলা হয়েছে, প্রয়োজনের তুলনায় বেশি স্যালাইন ব্যবহার করলে কিডনি ফেইলিওর, অ্যানিমিয়া বা অন্যান্য গুরুতর জটিলতা দেখা দিতে পারে।
চিকিৎসকদের একাংশ এই নতুন গাইডলাইনকে স্বাগত জানালেও তাঁদের দাবি, স্যালাইনের গুণগত মান নিশ্চিত না করলে নির্দেশিকা কার্যকর হবে না। তাঁদের মতে, সঠিক মানের স্যালাইন ব্যবহার করা না হলে, গাইডলাইন মেনে চিকিৎসা চালিয়েও প্রসূতি মৃত্যুর হার কমানো কঠিন হবে।
উল্লেখযোগ্যভাবে, গত জানুয়ারিতে মেদিনীপুর মেডিকেল কলেজে ঘটে গিয়েছিল এক মর্মান্তিক প্রসূতি মৃত্যুর ঘটনা। অভিযোগ ছিল, সিজার হওয়া ছ’জন প্রসূতি আচমকা গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। তাঁদের মধ্যে তিনজনকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় ভেন্টিলেশনে রাখতে হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত মারা যান মামণি রুইদাস নামে এক প্রসূতি, যার বাড়ি গড়বেতা থানা এলাকায়। মৃতার পরিবারের অভিযোগ ছিল, ভুল স্যালাইন প্রয়োগের ফলে ১২ ঘণ্টা ধরে প্রস্রাব বন্ধ ছিল, যা প্রাণঘাতী পরিস্থিতি তৈরি করে।
ঘটনার তদন্তে রাজ্য স্বাস্থ্য দপ্তরের একটি বিশেষ দল মেদিনীপুর মেডিকেল কলেজে পাঠানো হয়। পাশাপাশি, ড্রাগ কন্ট্রোল অফিসের একটি দলও হাসপাতালে উপস্থিত হয়ে ওষুধ ও স্যালাইনের নমুনা সংগ্রহ করে। এই ঘটনার পর রাজ্যের স্বাস্থ্য দপ্তর স্যালাইন ব্যবহারে কঠোর পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হয়েছে।
রাজ্যের সাম্প্রতিক সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, প্রসূতি মৃত্যুর সংখ্যায় কলকাতা শীর্ষে। ২০২৩ সালের এপ্রিল থেকে ২০২৪ সালের মার্চ পর্যন্ত রাজ্যে মোট ১১৬২ জন প্রসূতি মায়ের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে শুধু কলকাতার সরকারি হাসপাতাল ও মেডিকেল কলেজগুলোতেই ২০৪ জন প্রসূতি মারা গেছেন। এই উদ্বেগজনক পরিস্থিতির কারণে প্রসূতি মৃত্যুহার কমাতে স্বাস্থ্য দপ্তর সর্বস্তরে নতুন গাইডলাইন কার্যকর করার উদ্যোগ নিয়েছে।




















