রাজ্য – প্রিয় মহাতারকা লিওনেল মেসিকে এক ঝলক দেখার স্বপ্ন নিয়ে হাজার হাজার ফুটবলপ্রেমী ভিড় জমিয়েছিলেন যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনে। কিন্তু সেই স্বপ্ন পূরণের বদলে দর্শকদের ভাগ্যে জোটে বিশৃঙ্খলা, হতাশা ও ক্ষোভ। এই ঘটনার পর থেকেই একাংশের তরফে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে কুৎসিত আক্রমণের লক্ষ্য করা হচ্ছে। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে—যুবভারতীতে যা ঘটেছে, তার দায় কি আদৌ মুখ্যমন্ত্রীর উপর বর্তায়?
ঘটনার সময়রেখা বলছে, মুখ্যমন্ত্রী স্টেডিয়ামে পৌঁছনোর আগেই পরিস্থিতি হাতের বাইরে চলে যায়। মেসির ‘গোট শো’ কোনও সরকারি অনুষ্ঠান ছিল না, বরং একটি বেসরকারি সংস্থার উদ্যোগে আয়োজিত কর্মসূচি। আয়োজকরা যে সহযোগিতা চেয়েছিলেন, রাজ্য সরকার তা প্রদান করেছিল। ক্রীড়াদফতর, যুবভারতী কর্তৃপক্ষ ও পুলিশ প্রশাসন তাদের দায়িত্ব অনুযায়ী নজরদারি রেখেছিল। এর বাইরে ব্যক্তিগতভাবে মুখ্যমন্ত্রীর করার মতো কীই বা ছিল—এই প্রশ্নই এখন ঘুরপাক খাচ্ছে।
শনিবার নির্ধারিত সময়েই যুবভারতী স্টেডিয়ামে পৌঁছন লিওনেল মেসি। সঙ্গে ছিলেন লুইস সুয়ারেজ ও রডরিগো ডি’পল। কিন্তু আয়োজক ও বিভিন্ন ভিআইপিদের ভিড়ে কার্যত আড়ালেই পড়ে যান মেসি। মাঠে দাঁড়িয়ে হাসিমুখে দর্শকদের দিকে হাত নেড়েও গ্যালারিতে বসে থাকা বহু দর্শক তাঁকে ঠিকমতো দেখতে পাননি। সেখান থেকেই ক্ষোভ জমতে শুরু করে, যা দ্রুত রণক্ষেত্রের চেহারা নেয়। পরিস্থিতি বেগতিক বুঝে মেসি দ্রুত মাঠ ছাড়েন। এই আবহেই বাতিল হয় মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের স্টেডিয়ামে যাওয়ার কর্মসূচি।
যুবভারতীর ঘটনায় এক্স হ্যান্ডেলে দীর্ঘ পোস্ট করে মুখ্যমন্ত্রী নিজের প্রতিক্রিয়া জানান। তিনি লেখেন, সল্টলেক স্টেডিয়ামে যে অব্যবস্থা দেখা গিয়েছে, তাতে তিনি স্তম্ভিত ও মর্মাহত। তিনি মেসি এবং সমস্ত ক্রীড়াপ্রেমীদের কাছে ক্ষমা চান। পাশাপাশি দর্শকদের টাকা ফেরতের নির্দেশ দেন এবং অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি অসীম কুমার রায়ের নেতৃত্বে তদন্ত কমিটি গঠন করেন। ঘটনার পর পুলিশ বেসরকারি আয়োজককে গ্রেফতারও করে।
তবুও এখানেই থামেনি রাজনৈতিক কটাক্ষ। কেন্দ্রীয় প্রতিমন্ত্রী সুকান্ত মজুমদার এক্স হ্যান্ডেলে মুখ্যমন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করে লেখেন, রাজ্যের এই চূড়ান্ত অব্যবস্থার দায় সম্পূর্ণভাবে মুখ্যমন্ত্রীর উপরই বর্তায়। কংগ্রেস ও সিপিএমের তরফ থেকেও একই সুরে আক্রমণ শোনা যায়।
কিন্তু প্রশ্ন উঠছে—অন্যের ব্যর্থতার দায় মুখ্যমন্ত্রীর ঘাড়ে চাপানো কতটা যুক্তিযুক্ত? অতীতেও রাজ্যে বহু বড় আন্তর্জাতিক কর্মসূচি সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হয়েছে। এই মেসিই আগেও কলকাতায় খেলেছেন, তখনও রাজ্য প্রশাসন দক্ষতার সঙ্গে মানুষের আবেগ সামাল দিয়েছে। অথচ এবার একটি বেসরকারি আয়োজনের ব্যর্থতাকে হাতিয়ার করে মুখ্যমন্ত্রীকে কুৎসার মুখে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠছে।
উল্লেখ্য, মেসির কলকাতা সফর ছিল মাত্র কয়েক ঘণ্টার। অথচ এই স্বল্প সময়ের মধ্যেই তাঁর জন্য গুচ্ছগুচ্ছ কর্মসূচি সাজানো হয়েছিল—মূর্তি উন্মোচন, হোটেলে আলাপচারিতা, মাঠে ‘গোট কনসার্ট’, প্রাক্তনদের খেলা দেখা, স্পনসর ও ভিআইপিদের দাবি পূরণ। এর পাশাপাশি ছিল ভক্তদের সঙ্গে দেখা, করমর্দন ও ছবি তোলা, যার জন্য আলাদা রেট চার্টও নাকি নির্ধারিত ছিল।
এই বিপুল কর্মসূচি ও বাণিজ্যিক চাপের মধ্যেই প্রশ্ন উঠছে—একজন মানুষের পক্ষে কয়েক ঘণ্টায় এত কিছু করা কি আদৌ সম্ভব? অনেকের মতে, শুরু থেকেই দর্শকের আবেগের চেয়ে ব্যবসায়িক লাভকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল। টিকিটের দাম থেকে শুরু করে প্রতিটি সাক্ষাৎ, এমনকি স্টেডিয়ামের ভেতরে চড়া দামে জল বিক্রির অভিযোগও উঠেছে। বিশৃঙ্খলার মাঝেই গেরুয়া পতাকা ও ‘জয় শ্রীরাম’ স্লোগান চোখে পড়ায় বিতর্ক আরও ঘনীভূত হয়।
সব মিলিয়ে ওয়াকিবহাল মহলের ধারণা, প্রকৃত দায়ীদের আড়াল করতে গিয়ে রাজনৈতিক সুযোগসন্ধানীরা মুখ্যমন্ত্রীকে নিশানা করছেন। যুবভারতীর বিশৃঙ্খলার মূল কারণ যেখানে আয়োজকদের ব্যর্থতা ও অতিরিক্ত বাণিজ্যিক মানসিকতা, সেখানে দায় চাপানোর রাজনীতি নিয়েই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।




















