রাজ্য – শহরে শীতের ঘাটতির জেরে বাড়ছে বায়ুদূষণ। ভোরের দিকে কলকাতার বাতাস ক্রমশ অস্বাস্থ্যকর হয়ে উঠছে বলে দাবি করছেন পরিবেশবিদরা। দক্ষিণবঙ্গের বিভিন্ন জেলায় শীতের কামড় জোরালো হলেও কলকাতায় সেই শীত এখনও পর্যাপ্ত নয়। পুরুলিয়া ও বাঁকুড়ার মতো পশ্চিমাঞ্চলের জেলাগুলিতে কনকনে ঠান্ডায় মানুষ জবুথবু অবস্থায় থাকলেও মহানগরে শীতের আমেজ থাকলেও তার প্রভাব যথেষ্ট নয়।
পরিবেশবিদ ড. স্বাতী নন্দী চক্রবর্তী জানান, কলকাতায় শীত অনুভূত হলেও ডিসেম্বরে যে কনকনে ঠান্ডা থাকার কথা, তা এখনও অধরা। পাশাপাশি উত্তুরে হাওয়ার জোর না থাকায় বাতাসে ধূলিকণা জমে থাকছে। এই কারণেই শহরের বিভিন্ন এলাকায় দূষণমাত্রা বাড়ছে। বিশেষ করে যেসব এলাকায় যানবাহনের চাপ বেশি, সেখানে বাতাস আরও বেশি অস্বাস্থ্যকর হয়ে উঠছে।
শীতকালে শুষ্ক আবহাওয়ার কারণে সাধারণত ধূলিকণার পরিমাণ কিছুটা বাড়ে। কিন্তু এ বছর কলকাতায় ধূলিকণার মাত্রা অনেকটাই বেশি বলে জানাচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল ও ময়দান সংলগ্ন এলাকায় ভোরের দিকে বাতাসের গুণমান সূচক প্রায় ১৪৬-এ পৌঁছে যাচ্ছে। ড. স্বাতী নন্দী চক্রবর্তীর কথায়, ভোরে যে কুয়াশা দেখা যায়, তা আসলে ধোঁয়াশা। ধূলিকণা জমেই এই ধোঁয়াশা তৈরি হচ্ছে। উত্তুরে হাওয়ার জোর থাকলে এই কণাগুলি সরে যায়, কিন্তু হাওয়ার গতি কম থাকায় দূষণ একটি এলাকায় আটকে থাকছে।
সাধারণত শীতে শিশির পড়লে ধূলিকণার সঙ্গে তা মিশে বাতাস কিছুটা পরিষ্কার হয়। কিন্তু এ বছর শীতের খামখেয়ালিপনায় শিশিরও ঠিকভাবে পড়ছে না। ফলে ধূলিকণাগুলি বাতাসে জমাট বেঁধে থেকে ধোঁয়াশা তৈরি করছে, যা স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর।
দিল্লিতে যেখানে বায়ুদূষণ সূচক ৩০০ ছাড়িয়ে যাচ্ছে, সেখানে তুলনামূলকভাবে কলকাতার দূষণ কম হলেও তা স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক বেশি। সাধারণত কলকাতায় বাতাসের গুণমান সূচক ৭০ থেকে ৮০-এর মধ্যে থাকে। কিন্তু বর্তমানে দিনে শহরের বিভিন্ন এলাকায় একিউআই ২৫০ ছাড়িয়ে যাচ্ছে বলে জানাচ্ছেন পরিবেশবিদরা।
আর জি কর মেডিক্যাল কলেজের পালমোনারি মেডিসিন বিভাগের প্রাক্তন বিভাগীয় প্রধান ডা. সুস্মিতা কুণ্ডু জানিয়েছেন, শীতকালে খুব ভোরে প্রাতঃভ্রমণে না বেরনোই শ্রেয়। তাঁর মতে, ভোরের দিকে মাটির কাছের বাতাস ঠান্ডা ও ভারী থাকে, ফলে দূষণকণা উপরে উঠতে পারে না। ঘন ধোঁয়াশা সেই দূষণকণাগুলিকে আটকে রাখে। এর সঙ্গে শীতে কাঠকয়লা পোড়ানোর প্রবণতাও দূষণ বাড়িয়ে দেয়।
চিকিৎসকদের পরামর্শ, ভোর পাঁচটা বা সাড়ে পাঁচটায় হাঁটতে না বেরিয়ে সূর্যের আলো একটু ওঠার পর প্রাতঃভ্রমণে বেরোনো ভালো। খুব প্রয়োজন হলে ভোরে বেরোনোর সময় মাস্ক ব্যবহার করার কথাও জানিয়েছেন ডা. সুস্মিতা কুণ্ডু।
পরিবেশবিদ সোমেন্দ্রমোহন ঘোষের মতে, রবীন্দ্র সরোবরের মতো এলাকাতেও বর্তমানে দূষণমাত্রা লাগামছাড়া। সকালের দিকে সেখানে বর্জ্য পোড়ানো হচ্ছে এবং লেক চত্বরে দোকানের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় দূষণ আরও বাড়ছে। ভিক্টোরিয়া ও ময়দান অঞ্চলে মেট্রোর কাজ চলার কারণেও দূষণের মাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। তাঁর কথায়, সন্ধ্যা থেকে ভোর পর্যন্ত দূষণ সবচেয়ে বেশি থাকছে।
শীতে সাধারণত রাতে শিশির পড়ে ধূলিকণাগুলি জলে পরিণত হয়ে যায়। কিন্তু এবার শিশির কম পড়ায় ধূলিকণাগুলি বাতাসে থেকে ধোঁয়াশা তৈরি করছে। এই ধোঁয়াশার মধ্যেই বহু মানুষ ভোরে প্রাতঃভ্রমণে বেরোচ্ছেন, যা স্বাস্থ্যের পক্ষে ক্ষতিকর। তাই ভোরের দূষিত বাতাস এড়িয়ে চলারই পরামর্শ দিচ্ছেন পরিবেশবিদ ও চিকিৎসকরা।




















