দিল্লি – সংসদের ভিতর ও বাইরে উত্তাল রাজনৈতিক পরিস্থিতি। গরিব মানুষের রুজি-রোজগারের প্রশ্নে মুখোমুখি দাঁড়াল সরকার ও বিরোধী শিবির। মহাত্মা গান্ধী ন্যাশনাল রুরাল এমপ্লয়মেন্ট গ্যারান্টি অ্যাক্ট (MGNREGA)-এর পরিবর্তে নতুন আইন আনতে গিয়ে প্রবল চাপের মুখে পড়েছে কেন্দ্র। বৃহস্পতিবার রাজ্যসভায় কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়্গে যেভাবে সরকারের বিরুদ্ধে তোপ দাগেন, তাতে সংসদের পরিবেশ আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। রাত গভীর হওয়া পর্যন্ত চলতে থাকে হইচই ও বাদানুবাদ।
রাজ্যসভায় দাঁড়িয়ে খাড়্গের স্পষ্ট দাবি, এমজিএনরেগা তুলে দিলে মানুষ নেতাদের রাস্তায় হাঁটতেই দেবে না। তাঁর বক্তব্য, “এটা অত্যন্ত বড় ও গুরুত্বপূর্ণ আইন। গরিবের সঙ্গে যুক্ত কোনও আইনকে হালকা করে দেখার জায়গা নেই। এই আইন দুর্বল করার চেষ্টা মানে গরিব মানুষকে আবার দাসত্বে ঠেলে দেওয়া।” তাঁর অভিযোগ, প্রস্তাবিত বিকশিত ভারত গ্যারান্টি ফর রোজগার অ্যান্ড আজীবিকা মিশন (গ্রামীণ) বিল বা জি র্যাম জি আসলে গরিবের অধিকার কেড়ে নেওয়ারই নকশা।
আবেগতাড়িত ভাষণে কংগ্রেস সভাপতি বলেন, এমজিএনরেগা আনা হয়েছিল সেই মানুষদের মুখে ভাত জোগাতে, যাঁরা কাজ পেলেও নিয়মিত রোজগার পান না। আজ সেই অধিকার কেড়ে নেওয়া হচ্ছে কেন—এই প্রশ্ন তোলেন তিনি। খাড়্গের কটাক্ষ, “গরিবকে দুর্বল করতে, ভেঙে ফেলতে, আবার দাস বানাতেই এই চেষ্টা।” কৃষক আন্দোলনের প্রসঙ্গ টেনে তিনি মনে করিয়ে দেন, ২০২১ সালে যেমন তিনটি বিতর্কিত কৃষি আইন প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয়েছিল সরকার, তেমন পরিস্থিতি আবার আসবে। তাঁর হুঁশিয়ারি, “আমরা রাস্তায় নামব, গুলির সামনেও দাঁড়াব, কিন্তু এই আইন মানব না।”
খাড়্গের আরও অভিযোগ, ধীরে ধীরে বিষপ্রয়োগ করে এমজিএনরেগাকে শেষ করছে সরকার। তিনি পরিসংখ্যান তুলে ধরে বলেন, ২০২০-২১ সালে যেখানে এমজিএনরেগার বরাদ্দ ছিল ১ লক্ষ ১১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা, সেখানে ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৮৬ হাজার কোটি টাকায়। গেরুয়া শিবিরকে আক্রমণ করে তাঁর কটাক্ষ, “মুখে রাম, বগলে ছুরি—গরিবের জন্য রাম রাম, আর সামনে-পেছনে ছুরি মারছেন।”
এই তীব্র বিতর্কের মধ্যেই সংসদের দুই কক্ষে ঝড়ের গতিতে পাশ হয়ে যায় জি র্যাম জি বিল। লোকসভায় প্রতিবাদ ও ওয়াকআউটের মধ্যেও বৃহস্পতিবার দুপুরে বিল পাশ হয়। রাজ্যসভায় মধ্যরাত পেরিয়ে প্রায় রাত ১২টা ১৫ মিনিটে ভয়েস ভোটে গৃহীত হয় বিলটি। সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে ফলাফল নিয়ে সন্দেহ না থাকলেও বিরোধীরা শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লড়াই চালায়—কখনও স্ট্যান্ডিং কমিটিতে পাঠানোর দাবি, কখনও পুরো বিল প্রত্যাহারের ডাক। শেষ পর্যন্ত ওয়াকআউট করে প্রতিবাদ জানায় বিরোধী শিবির। পরে সংসদ চত্বরে তৃণমূল কংগ্রেসসহ একাধিক বিরোধী দলের সাংসদরা ধর্নায় বসেন।
তৃণমূল কংগ্রেসের ডেরেক ও’ব্রায়েন বিলটিকে ‘জমিদারি মানসিকতার ফল’ বলে কটাক্ষ করেন। তাঁর অভিযোগ, এমজিএনরেগা ছিল মানুষের অধিকার, আর নতুন বিল সেটাকে ভোটের আগে দয়ার দান হিসেবে তুলে ধরতে চাইছে সরকার। তিনি আরও দাবি করেন, লোকসভায় বিল পাশ হওয়ার কয়েক মিনিটের মধ্যেই পশ্চিমবঙ্গে এমজিএনরেগা কার্যত বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। রাজ্য সরকার বিকল্প হিসেবে কর্মশ্রী প্রকল্প চালু করেছে, যেখানে চলতি বছরে ৭৫ দিন এবং আগামী বছরে ১০০ দিনের কাজ নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি প্রকল্পের নাম বদলে মহাত্মশ্রী করা হয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
বিলের পক্ষে সওয়াল করতে উঠে গ্রামোন্নয়নমন্ত্রী শিবরাজ সিং চৌহান বিরোধীদের তীব্র আক্রমণ করেন। তাঁর অভিযোগ, বক্তব্য রেখে পালিয়ে যাওয়া গান্ধীর আদর্শের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা। তাঁর দাবি, এমজিএনরেগা দুর্নীতির আখড়া হয়ে উঠেছিল এবং নতুন আইন সব পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করেই আনা হয়েছে। কংগ্রেসকে কটাক্ষ করে তিনি বলেন, “বাপু আমাদের অনুপ্রেরণা। কংগ্রেসই প্রথমে তাঁর নাম রাখেনি, ২০০৯ সালের ভোটের আগে গিয়ে নাম জুড়েছিল।”
নতুন আইনে কাজের গ্যারান্টি ১০০ দিন থেকে বাড়িয়ে ১২৫ দিন করা হলেও কাজ হবে পূর্বনির্ধারিত প্রকল্পের ভিত্তিতে। সমালোচকদের মতে, এতে মানুষের চাহিদার বদলে প্রশাসনিক পরিকল্পনাই বেশি গুরুত্ব পাবে। কাজের ক্ষেত্রকে চারটি ভাগে ভাগ করা হয়েছে—জল সুরক্ষা, গ্রামীণ পরিকাঠামো, জীবিকাভিত্তিক সম্পদ এবং জলবায়ু সহনশীলতা।
সব মিলিয়ে স্পষ্ট, এমজিএনরেগা বনাম জি র্যাম জি বিতর্ক শুধু একটি আইনের প্রশ্ন নয়, বরং গরিবের অধিকার ও রাজনৈতিক মতাদর্শের সরাসরি সংঘর্ষ। সংসদে বিল পাশ হলেও এই লড়াই যে সংসদের বাইরে, রাস্তায় গড়াবে—তার ইঙ্গিত ইতিমধ্যেই দিয়ে দিয়েছে বিরোধী শিবির।




















