উত্তরবঙ্গ – অসমের হোজাই জেলায় শনিবার ভোররাতে এক মর্মান্তিক রেল দুর্ঘটনা ঘটে গেল। সাইরাং–নয়াদিল্লি রাজধানী এক্সপ্রেসের সঙ্গে একটি হাতির পালের সংঘর্ষে অন্তত ৮টি হাতির মৃত্যু হয়েছে। দুর্ঘটনায় গুরুতর জখম হয়েছে একটি হাতির শাবক, যাকে পরে বন দফতরের কর্মীরা উদ্ধার করেন। এই ঘটনার জেরে উত্তর-পূর্ব ভারতের রেল চলাচলেও বড়সড় ব্যাঘাত ঘটে।
রেল ও বন দফতর সূত্রে জানা গিয়েছে, শনিবার ভোর আনুমানিক ২টা ১৭ মিনিট নাগাদ রাজধানী এক্সপ্রেসটি মিজোরামের সাইরাং থেকে নয়াদিল্লির আনন্দ বিহার টার্মিনালের উদ্দেশে যাচ্ছিল। হোজাইয়ের কাছে হঠাৎ করেই লাইনের উপর উঠে আসে একটি হাতির দল। লোকো পাইলট হাতিগুলিকে দেখতে পেয়ে জরুরি ব্রেক কষেন, কিন্তু তাতেও সংঘর্ষ এড়ানো সম্ভব হয়নি।
সংঘর্ষের জেরে হাতিরা ট্রেনের সামনে ধাক্কা খেলে ইঞ্জিন ও পাঁচটি কোচ লাইনচ্যুত হয়ে পড়ে। বন দফতরের আধিকারিকরা জানিয়েছেন, দুর্ঘটনায় মোট ৮টি হাতির মৃত্যু হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, ওই পালে মোট ৮টি হাতিই ছিল এবং সংঘর্ষে অধিকাংশেরই প্রাণ যায়। উল্লেখযোগ্যভাবে, যে এলাকায় দুর্ঘটনাটি ঘটেছে, সেটি কোনও ঘোষিত হাতির করিডর নয়।
রেল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এই দুর্ঘটনায় কোনও যাত্রী হতাহত হননি। তবে ট্রেন লাইনচ্যুত হওয়া এবং লাইনের উপর হাতির দেহাংশ ছড়িয়ে পড়ায় আপার অসম ও উত্তর-পূর্ব ভারতের বিভিন্ন রুটে রেল পরিষেবা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। খবর পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছয় রেল দুর্ঘটনা মোকাবিলা দল ও ঊর্ধ্বতন আধিকারিকরা।
রেল সূত্রে আরও জানানো হয়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত কোচের যাত্রীদের সাময়িকভাবে ট্রেনের অন্যান্য কোচের ফাঁকা বার্থে স্থান দেওয়া হয়েছে। ট্রেনটি গুয়াহাটিতে পৌঁছনোর পর অতিরিক্ত কোচ যুক্ত করে সকল যাত্রীকে গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হবে।
এই দুর্ঘটনার পর ফের রেললাইন ও বন্যপ্রাণীর সংঘর্ষ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে হাতির করিডরের বাইরেও এমন ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটায় বন ও রেল দফতরের মধ্যে সমন্বয় এবং আগাম সতর্কতামূলক ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
ভারতের দ্রুত বিস্তৃত রেল নেটওয়ার্ক যে ক্রমশ বন্যপ্রাণের জন্য বড় বিপদের কারণ হয়ে উঠছে, তা আবারও স্পষ্ট হল এই ঘটনায়। একটি সাম্প্রতিক সরকারি সমীক্ষা অনুযায়ী, ২০০৯–১০ অর্থবর্ষ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ট্রেনের সঙ্গে সংঘর্ষে দেশে অন্তত ১৮৬টি হাতির মৃত্যু হয়েছে। এই উদ্বেগজনক পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে কেন্দ্র ১৪টি রাজ্যের ৭৭টি রেলপথকে উচ্চঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
কেন্দ্রীয় পরিবেশ মন্ত্রক, রেল মন্ত্রক ও সংশ্লিষ্ট রাজ্য বন দফতরের যৌথ উদ্যোগে চালানো ওই সমীক্ষায় ১২৭টি রেলপথ, মোট প্রায় ৩,৪৫২ কিলোমিটার এলাকা বিশ্লেষণ করা হয়। অতীতের হাতির চলাচল ও মৃত্যুর তথ্য বিচার করে তার মধ্যে ৭৭টি রেলপথকে সবচেয়ে বিপজ্জনক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
সমীক্ষার ভিত্তিতে হাতির মৃত্যু কমাতে ৭০৫টি বিশেষ কাঠামো তৈরির প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে র্যাম্প ও লেভেল ক্রসিং, সেতুর সম্প্রসারণ, আন্ডারপাস, ওভারপাস, বেড়া ও ট্রেঞ্চ। লক্ষ্য একটাই—হাতিদের নিরাপদে রেললাইন পার হওয়ার সুযোগ করে দেওয়া এবং সংঘর্ষের ঝুঁকি কমানো।
হাতির সংখ্যা বেশি এমন রাজ্যগুলিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। অসমে তৈরি হবে ১৩১টি লেভেল ক্রসিং ও র্যাম্প, মহারাষ্ট্রে ১২৫টি এবং উত্তরপ্রদেশে ৯২টি। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ব্যবস্থা কার্যকরভাবে রূপায়িত না হলে ভবিষ্যতে এমন দুর্ঘটনা আরও বাড়তে পারে।




















