বিদেশ – আমেরিকায় ভারতীয় চাকরিজীবী ও ভারতীয় মালিকানাধীন ব্যবসার বিরুদ্ধে বিদ্বেষ ও শত্রুতার মাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে বলে দাবি করছেন একাধিক বিশেষজ্ঞ। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, ট্রাম্প প্রশাসনের আমলে এইচ-১বি ভিসা ব্যবস্থায় বড়সড় পরিবর্তনের পর থেকেই এই পরিস্থিতি আরও প্রকট আকার ধারণ করেছে।
গত সেপ্টেম্বর মাসে এইচ-১বি ভিসা নীতিতে আনা সংশোধনের ফলে আবেদনকারীদের জন্য ভিসার আবেদনমূল্য এক ধাক্কায় বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ লক্ষ ডলার। একই সঙ্গে চালু হয়েছে মজুরি-ভিত্তিক বাছাই পদ্ধতি, যেখানে তুলনামূলক বেশি বেতনের চাকরির আবেদনকারীদের অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। ট্রাম্প প্রশাসনের যুক্তি, এই পরিবর্তনের মূল লক্ষ্য ‘আমেরিকান কর্মীদের সুরক্ষা’ নিশ্চিত করা।
আগামী ফেব্রুয়ারি থেকে এই কড়াকড়ি আরও বাড়তে পারে বলে ইঙ্গিত মিলেছে। মার্কিন কর্তৃপক্ষ তখন মূলত সর্বোচ্চ বেতনপ্রাপ্ত, অর্থাৎ লেভেল-ফোর এইচ-১বি আবেদনকারীদেরই অগ্রাধিকার দিতে পারে। এর ফলে বহু দক্ষ অভিবাসীর পক্ষেই এই ভিসা পাওয়া কার্যত আরও কঠিন হয়ে উঠবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
এই নীতির প্রভাব সমাজের নানা স্তরে পড়তে শুরু করেছে। ফেডএক্স, ওয়ালমার্ট ও ভেরাইজনের মতো একাধিক বড় মার্কিন সংস্থা সম্প্রতি সোশ্যাল মিডিয়ায় তীব্র আক্রমণের মুখে পড়েছে। অভিযোগ তোলা হচ্ছে, এই সংস্থাগুলি নাকি বেআইনিভাবে ভারতীয় কর্মীদের ‘চাকরি বিক্রি’ করছে বা অগ্রাধিকার দিচ্ছে।
সেন্টার ফর দ্য স্টাডি অব অর্গানাইজড হেট-এর নির্বাহী পরিচালক রাকিব নায়েকের দাবি, এই আক্রমণের বড় অংশই সংগঠিত। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, সরকারি সহায়তায় ঋণ পাওয়া ভারতীয়-মার্কিন উদ্যোক্তাদেরও পরিকল্পিতভাবে নিশানা করা হচ্ছে। ভারতীয়দের ‘চাকরি চোর’ বা ‘ভিসা প্রতারক’ হিসেবে চিহ্নিত করার প্রবণতা উদ্বেগজনকভাবে বেড়ে চলেছে।
পরিসংখ্যানও এই প্রবণতার ইঙ্গিত দিচ্ছে। ‘স্টপ এএপিআই হেট’ এবং সন্ত্রাসবিরোধী সংস্থা মুনশট-এর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, গত বছরের নভেম্বর মাসে দক্ষিণ এশীয়দের বিরুদ্ধে হিংসার হুমকি বেড়েছে ১২ শতাংশ। একই সময়ে অনলাইনে গালিগালাজ ও বিদ্বেষমূলক মন্তব্য ব্যবহারের হার বেড়েছে প্রায় ৬৯ শতাংশ।
এই পরিস্থিতির মধ্যেই আমেরিকায় ভারতীয় পেশাজীবীদের সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার, ডাক্তার, গবেষক ও প্রযুক্তিবিদ—দক্ষ কর্মীর ঘাটতি মেটাতে ভারত থেকে এখনও বিপুল সংখ্যক কর্মী নিয়োগ করছে মার্কিন সংস্থাগুলি।
ক্রিসমাসের আগে ফেডএক্স সংক্রান্ত একটি ভাইরাল ভিডিও পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করে তোলে। ক্ষতিগ্রস্ত ফেডএক্স ট্রাকের সেই ভিডিও ঘিরে সোশ্যাল মিডিয়ায় সংস্থার ভারতীয় বংশোদ্ভূত সিইও রাজ সুব্রহ্মণ্যমকে সরাসরি আক্রমণ করা হয়। কিছু পোস্টে প্রকাশ্যে ভারতীয়দের বিরুদ্ধে ‘আমেরিকান কোম্পানি দখল’ করার অভিযোগও তোলা হয়।
ডানপন্থী একাধিক ভাষ্যকার দাবি করেন, শ্বেতাঙ্গ কর্মীদের ছাঁটাই করে ভারতীয়দের নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে। যদিও ফেডএক্স এই অভিযোগ সম্পূর্ণভাবে খারিজ করেছে। সংস্থার বক্তব্য, নিয়োগ প্রক্রিয়ায় যোগ্যতাই একমাত্র মাপকাঠি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কর্পোরেট দুনিয়ায় ডিইআই কর্মসূচি গুটিয়ে নেওয়া, কঠোর অভিবাসন নীতি এবং রাজনৈতিক ভাষ্য—সব মিলিয়ে এমন এক পরিবেশ তৈরি হয়েছে, যেখানে আমেরিকায় ভারতীয় পেশাজীবী ও ব্যবসায়ীরা ক্রমশ আলাদা করে টার্গেট হচ্ছেন।




















