ভোটার তালিকা সংশোধনে কড়া সুপ্রিম কোর্ট, এসআইআর নিয়ে রাজ্য ও নির্বাচন কমিশন—দু’পক্ষকেই স্পষ্ট বার্তা

ভোটার তালিকা সংশোধনে কড়া সুপ্রিম কোর্ট, এসআইআর নিয়ে রাজ্য ও নির্বাচন কমিশন—দু’পক্ষকেই স্পষ্ট বার্তা

Facebook
Twitter
LinkedIn
Email
WhatsApp
Print
Telegram


রাজ্য – ভোটার তালিকার স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন (SIR) প্রক্রিয়া নিয়ে রাজ্য সরকার ও নির্বাচন কমিশন—উভয় পক্ষকেই কড়া ও স্পষ্ট বার্তা দিল সুপ্রিম কোর্ট। সোমবার শীর্ষ আদালত জানিয়ে দেয়, এসআইআর সংক্রান্ত কাজে কোনও রকম বাধা বরদাস্ত করা হবে না। নির্বাচন কমিশনের নোটিস পাঠানোর পদ্ধতির পাশাপাশি রাজ্য সরকার ও পুলিশের ভূমিকাও আদালতের প্রশ্নের মুখে পড়ে। প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত স্পষ্ট জানিয়ে দেন, এসআইআর সংক্রান্ত কোনও গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রয়োজন হলে তা কেবল আদালতই নেবে। মামলার পরবর্তী শুনানি হবে আগামী ২০ ফেব্রুয়ারি।
গত বুধবারের পর সোমবার ফের প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন বেঞ্চে ওঠে এসআইআর সংক্রান্ত মামলা। একই সঙ্গে শুনানি হয় মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের করা মামলারও। তিন বিচারপতির বেঞ্চে প্রায় দেড় ঘণ্টা ধরে চলে সওয়াল-জবাব। আগের শুনানিতে মুখ্যমন্ত্রী নিজে উপস্থিত থাকলেও এদিন তাঁর হয়ে সওয়াল করেন আইনজীবী শ্যাম দিওয়ান। তিনি আদালতে জানান, রাজ্যের একমাত্র উদ্বেগ হল—যেন গণহারে ভোটারদের নাম তালিকা থেকে বাদ না পড়ে।
নামের বানানে সামান্য অমিল থাকলে ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়া যাবে কি না, সে বিষয়ে নির্বাচন কমিশনকে নির্দিষ্ট নির্দেশ দেওয়ার আবেদন জানায় রাজ্য। কমিশনের কাজের ধরন নিয়ে প্রশ্ন তুললেও এই মুহূর্তে কোনও অন্তর্বর্তী নির্দেশ দিতে রাজি হয়নি সুপ্রিম কোর্ট।
এসআইআর-এর কাজে রাজ্য সরকার যে ৮,৫০৫ জন কর্মী কমিশনকে দিয়েছে, তা নিয়েও কড়া প্রশ্ন তোলে আদালত। বিচারপতিরা জানতে চান, ওই কর্মীদের নামের পূর্ণাঙ্গ তালিকা আদৌ রয়েছে কি না। রাজ্যের তরফে জানানো হয়, জেলাভিত্তিক তথ্য দেওয়া হয়েছে এবং সবাই গ্রুপ-বি আধিকারিক। তবে কমিশনের দাবি, তারা সেই তালিকা হাতে পায়নি। আদালতের মন্তব্য ছিল, এর অর্থ নামের তালিকা এখনও সম্পূর্ণ হয়নি।
নতুন কর্মীদের প্রশিক্ষণ ছাড়াই কাজে নামানো হচ্ছে কি না, তা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করে নির্বাচন কমিশন। কমিশনের আইনজীবী জানান, পাঁচবার চিঠি দিয়েও নির্দিষ্ট শ্রেণির আধিকারিক পাওয়া যায়নি। তাদের দাবি, ৩০০ জন গ্রুপ-বি আধিকারিক চাওয়া হলেও পাওয়া গেছে মাত্র ৮০ জন, বাকিরা গ্রুপ-সি বা অন্য শ্রেণির। যদিও রাজ্যের তরফে অভিষেক মনু সিঙ্ঘভি দাবি করেন, কমিশন কখনও গ্রুপ-বি আধিকারিক চায়নি।
কমিশনের আরও অভিযোগ, রাজ্য সরকার সহযোগিতা করছে না এবং একাধিক ক্ষেত্রে সাসপেনশন বা এফআইআর পর্যন্ত করা হচ্ছে না। আদালতে কমিশনের আইনজীবীর বক্তব্য, প্রতিটি ধাপে রাজ্যের অসহযোগিতা কমিশনের কাজকে ব্যাহত করছে।
তবে শুধু রাজ্য নয়, নির্বাচন কমিশনের কাজকর্মও কঠোরভাবে খতিয়ে দেখে সুপ্রিম কোর্ট। ভোটারদের শুনানির জন্য যেভাবে নোটিস পাঠানো হচ্ছে, তা নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেন বিচারপতিরা। বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী মন্তব্য করেন, সফটওয়্যারের মাধ্যমে নামের সামান্য পার্থক্য থাকলেই নোটিস পাঠানো হচ্ছে। তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, বাংলায় ‘কুমার’ অনেক সময় মধ্যনাম হিসেবে থাকে, সেটি বাদ পড়লেই নোটিস পাঠানো হচ্ছে। এমনকি বয়সের ব্যবধান দেখিয়ে দাদু-নাতির সম্পর্ক ধরে নেওয়া কিংবা একাধিক সন্তান থাকার কারণে নোটিস পাঠানোর বিষয়টিও বাস্তবতার সঙ্গে অসঙ্গত বলে মন্তব্য করেন তিনি।
শীর্ষ আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী, রাজ্যকে নিশ্চিত করতে হবে যে ৮,৫০৫ জন কর্মী সকলেই গ্রুপ-বি আধিকারিক। মঙ্গলবার বিকেল পাঁচটার মধ্যে তাঁদের সংশ্লিষ্ট জেলা নির্বাচন আধিকারিক বা ইআরও-র কাছে রিপোর্ট করতে হবে। এই কর্মীদের জন্য দু’দিনের প্রশিক্ষণের অনুমতিও দেওয়া হয়েছে। ভোটারদের নথি যাচাইয়ের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন কেবল ইআরও-রাই এবং প্রয়োজনে কমিশন ইআরও ও এআরও বদলাতে পারবে।
এছাড়াও আদালত জানায়, ১৪ ফেব্রুয়ারির পর আরও এক সপ্তাহ সময় পাবেন ইআরও-রা, যাতে নথি যাচাই করে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়। এই নির্দেশের পর রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকের দফতর ইঙ্গিত দেয়, চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশের দিন ২১ ফেব্রুয়ারির পরেও পিছোতে পারে। কারণ এখনও প্রায় ১০ থেকে ১২ লক্ষ ভোটারের শুনানি বাকি রয়েছে।
এসআইআর সংক্রান্ত ফর্ম পোড়ানোর অভিযোগ নিয়েও কড়া অবস্থান নেয় সুপ্রিম কোর্ট। এই ঘটনায় এফআইআর না হওয়ায় রাজ্য পুলিশের ডিজি-কে শোকজ করা হয়েছে। হলফনামা দিয়ে কারণ ব্যাখ্যা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কমিশনের নির্দেশে কর্মীদের সাসপেনশন প্রসঙ্গে আদালতের মন্তব্য, আইন অনুযায়ী রাজ্য কী করা উচিত, তা রাজ্য নিশ্চয়ই জানে।

RECOMMENDED FOR YOU.....

Scroll to Top