পূর্ব ভারতে প্রথম! মৃত দাতার হাড়ে জীবিতের হাঁটু পুনর্গঠন, নজির গড়ল কলকাতার আরজি কর

পূর্ব ভারতে প্রথম! মৃত দাতার হাড়ে জীবিতের হাঁটু পুনর্গঠন, নজির গড়ল কলকাতার আরজি কর

Facebook
Twitter
LinkedIn
Email
WhatsApp
Print
Telegram


রাজ্য – পূর্ব ভারতে প্রথমবার মৃত দাতার হাড় এনে জীবিত রোগীর শরীরে সফল প্রতিস্থাপন করে চিকিৎসা বিজ্ঞানে নতুন ইতিহাস গড়ল কলকাতা। উত্তর ২৪ পরগনার বিরার বাসিন্দা ৩১ বছরের শ্রমিক রিজাউদ্দিন মণ্ডলের ডান পায়ের ডিস্টাল ফিমার প্রতিস্থাপন করা হয়েছে সদ্য মৃত দাতার হাড় দিয়ে। অস্ত্রোপচারটি সম্পন্ন হয়েছে RG Kar Medical College and Hospital-এ। হাসপাতাল সূত্রের দাবি, পূর্ব ভারতে ডিস্টাল ফিমারের এমন অ্যালোগ্রাফট রিকনস্ট্রাকশন এই প্রথম।
২০২৩ সালে এক ভয়াবহ লরি দুর্ঘটনায় গুরুতরভাবে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যায় রিজাউদ্দিনের ডান পায়ের হাঁটুর কাছের উরুর হাড়, অর্থাৎ ডিস্টাল ফিমার। ‘ওপেন ফ্র্যাকচার’-এর সঙ্গে তৈরি হয় বড়সড় হাড়ের ঘাটতি। দীর্ঘ প্রায় আড়াই বছরের চিকিৎসায় অন্যান্য শারীরিক জটিলতা কাটলেও স্বাভাবিক হাঁটাচলার ক্ষমতা হারান তিনি। একাধিক অস্ত্রোপচার সত্ত্বেও কাঙ্ক্ষিত ফল মেলেনি।
২০২৩ সালের মে মাসে প্রথম অস্ত্রোপচার হয়। খোলা ক্ষত ঢাকতে জুনে প্লাস্টিক সার্জারি করা হয়। কিন্তু হাড়ের জটিলতা না কাটায় অগস্টে আবার অস্ত্রোপচার করতে হয়। ২০২৪ সালে ধরা পড়ে গুরুতর বোন ডিফেক্ট। রোগীর নিজের হাঁটুর প্যাটেলা থেকে অটোগ্রাফট নিয়ে জুলাই ২০২৪-এ আরও একটি অস্ত্রোপচার হলেও তাতেও সাফল্য আসেনি। পরিস্থিতি এমন জায়গায় পৌঁছয় যে চাকরি ছাড়তে বাধ্য হন রিজাউদ্দিন।
অর্থোপেডিক বিভাগের চিকিৎসক ডা. সঞ্জয় কুমারের কথায়, তখন সামনে ছিল দুটি পথ—দুর্ঘটনাগ্রস্ত পা কেটে বাদ দেওয়া অথবা সদ্য মৃত দাতার থাইয়ের হাড়ের অংশ দিয়ে পুনর্গঠন। প্রথম বিকল্পে রোগীর জীবনমানের উল্লেখযোগ্য উন্নতি সম্ভব ছিল না। তাই বেছে নেওয়া হয় ‘ফ্রেশ ক্যাডাভেরিক অ্যালোগ্রাফট’-এর পথ। এই টিমে ছিলেন অর্থোপেডিক সার্জেন ডা. সুনীত হাজরা, ডা. সুমন্ত পাল সহ অন্যান্য চিকিৎসকরা।
কলকাতায় এই ধরনের হাড় সহজলভ্য না হওয়ায় দেশের সংশ্লিষ্ট সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। রোগীর ক্ষতিগ্রস্ত অংশের থ্রি-ডি প্রিন্ট মডেল তৈরি করে পাঠানো হয়, সেই মাপ অনুযায়ী সংগ্রহ করা হয় দাতার হাড়। হাসপাতাল প্রশাসনের অনুমোদনে রোগীর জন্য ২.৪ লক্ষ টাকা মঞ্জুর হয়। সমস্ত প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে গত ১৭ ফেব্রুয়ারি সফলভাবে অ্যালোগ্রাফট ফিক্সেশন করা হয়।
এই ধরনের প্রতিস্থাপনে দাতা হন মৃত ব্যক্তি, কারণ জীবিত কেউ হাঁটুর হাড় দান করলে নিজেই অক্ষম হয়ে পড়বেন। মৃতদেহ থেকে সংগৃহীত হাড় বসানোর পর কয়েক মাস সময় লাগে তা শরীরের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে। ধীরে ধীরে প্রতিস্থাপিত হাড় রোগীর শরীরের অঙ্গ হয়ে যায়। সাধারণত মারাত্মক দুর্ঘটনায় যখন কৃত্রিম উপাদান কার্যকর হয় না, তখনই মানবদেহের হাড় একমাত্র বিকল্প হয়ে ওঠে—যেমনটা হয়েছে রিজাউদ্দিনের ক্ষেত্রে।
অস্ত্রোপচারের পর প্রাথমিকভাবে হাঁটুর পুনর্গঠন সন্তোষজনক হয়েছে বলে জানিয়েছে অর্থোপেডিক্স বিভাগ। বর্তমানে পর্যবেক্ষণে রয়েছেন রিজাউদ্দিন। চিকিৎসকদের আশা, কয়েক মাসের মধ্যেই তিনি স্বাভাবিক ও কর্মক্ষম জীবনে ফিরতে পারবেন। এই সাফল্য কলকাতার ট্রমা কেয়ার চিকিৎসায় এক নতুন দিগন্ত খুলে দিল।

RECOMMENDED FOR YOU.....

Scroll to Top