‘দেশের স্বাধীনতার জন্য গো-মাংস কেন, ইঁদুরের মাংস খেতে হলেও রাজী’ নেতাজী

‘দেশের স্বাধীনতার জন্য গো-মাংস কেন, ইঁদুরের মাংস খেতে হলেও রাজী’ নেতাজী। “ইট’স ইমপসিবল। অসম্ভব। ‘ অসম্ভব ! কেন অসম্ভব? ‘এটাকে অসম্ভব ছাড়া আর কি বলব বল? যদি তিনি সত্যিই বেঁচে থাকতেন তাহলে এতদিন লুকিয়ে থাকতেন কার ভয়ে? কি মোক্ষ লাভের আশায়? আফটার অল হি ইজ নট শার্লক হোমস, নর হি ইজ এ জেমস বন্ড।’ আপনার যুক্তিটা ঠিক। কিন্ত সত্যনারায়ণ সিংয়ের কথা যদি সত্য হয় তবে আপনার যুক্তিটা যে এক মুহূর্তে ধূলিসাৎ হয়ে যাবে ।’ কি কথা ?

 

তাঁকে সাইবেরিয়ার জেলে বন্দি করে রাখা হয়েছে।’ ‘ই-ন্ডি-য়-ট ‘। ‘কে, আমি না সত্যনারায়ন সিং ?’ ‘বোথ অব ইউ। যারা এমন গাঁজাখুরী গল্প রটায় এবং যারা সে গল্প বিশ্বাস করে তাদের দুজনের মধ্যে কোন পার্থক্য দেখি না।’ ডক্টর ভারমা প্রায়-নিভে আসা হাভানা চুরুটটায় প্রচন্ড জোরে একটা টান দিয়ে চোখ দুটো বুজে তর্ক- বিতর্ক ক্লান্ত দেহটাকে আলতো ভাবে এলিয়ে দিলেন ইজি চেয়ারটায়। তারপর পরম নিশ্চিন্তে সিগারেটটায় সুখ টান দিতে লাগলেন। আমি, শশিভূষণ এবং রাকেশ বেশ উৎকন্ঠিত দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে রইলাম ডক্টর অশোক ভারমার মুখের দিকে।

 

বহুদিনের অভিজ্ঞতা থেকে এটা আমাদের সবার জানা হয়ে গেছে, ডক্টর ভারমার চোখ বুজে চুরুটে এমন নিশ্চিন্তে টান দেওয়াটা তার পরবর্তি আধ্যায় শুরুর প্রস্তুতি মাত্র। সুতরাং নতুন কিছু শোনার আশায় আমরা সবাই নড়েচড়ে বসলাম। ডক্টর ভারমা নেহেরু ইউনিভার্সিটির দুর প্রাচ্য শাখার একজন বিশেষজ্ঞ। দেশ উত্তর প্রদেশের বালিয়া জেলায়। ভদ্রলোক দিল্লী ইউনিভার্সিটি থেকে পলিটিক্যাল সায়েন্স – এম এ পাশ করার পর বিশেষ সরকারি বৃত্তি পেয়ে আমেরিকায় চলে গিয়েছিলেন ফিলাডেলফিয়া ইউনিভার্সিটিতে দুর প্রাচ্যে শাখার একজন রাজনৈতিক ধারা নিয়ে গবেষণা করার জন্যে । সেখান থেকে যথাসময়ে ডক্টরেট ডিগ্রি নিয়ে দেশে ফিরে সরাসরি যোগদান করেছেন তার বর্তমান কর্মস্থলে। এখানকার সরকারি মহলে দুর প্রাচ্যের বিশেষজ্ঞ হিসাবে ডদ্রলোকের যথেষ্ট খ্যাতি আছে।

 

তার মতামতকে এখানে সকলেই বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে গ্রহণ করে থাকে। পেজ ৬৩- নরওয়েবাসীদের সেই দুর্দিনে, প্রতিহিংসাপরায়ণ জার্মান সেনাবাহিনীর হাতে স্বদেশবাসীর জীবন, সম্পত্তি যাতে ধ্বংস না হয়, সেকথা চিন্তা করে জার্মান সেনানানায়কদের সঙ্গে আলাপ আলোচনার মাধ্যমে দেশ শাসনের ভার নরওয়েজিয়ানদের হাতেই রেখে দেয়ার পরিকল্পনা নিয়ে একজন নরওয়েজিয়ান সৈনিক সেদিন নির্ভিক চিত্তে এগিয়ে এসেছিলেন। সেই অসম সাহসিক সৈনিকের নাম মেজর ‘ভিডকুন কুইসলিং’। বহু আলোচনার পর কুইসলিং জার্মানদের রাজী করিয়েছিলেন একটা দেশীয় সরকার গঠনের অনুমতি দানের জন্য। বৃটিশ ও তাদের সাঙ্গ পাঙ্গদের কানে যখন কথাটা গেল, তখন তারা সারা দুনিয়া জুড়ে হৈচৈ লাগিয়ে দিল।

 

দিন নেই রাত নেই বৃটিশ প্রচার দপ্তর সংবাদপত্র , বেতার, সভাসমিতি মারফত ক্রমাগত চিৎকার করে চলল, বেইমান, বেইমান, বেইমান বলে। বি.বি.সি.র সদর দফতরে কাজের সুবিধার জন্য তো একটা টেপ রেকর্ডই তৈরি হয়ে গেল। সকাল নেই, দুপুর নেই, রাত নেই- সেটা ক্রমাগত বেজে চলল: বেইমান কুইসলিং, বেইমান কুইসলিং, বেইমান কুইসলিং, আবৃত্তি করে । সেদিন বৃটিশ প্রচারের ধার এত বেশী ছিল যে সারা দুনিয়ার একটা লোকও তাদের কাছে আসল কথাটা জানতে চাইল না। কেউ একবার প্রশ্নও করল না যে আসল কুইসলিং কে ? যিনি তাঁর দেশবাসীকে এতবড় বিপদের দিনে নাজীদের অত্যাচারের হাত থেকে রক্ষা করার দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন সেই মেজর ভিডকুইন কুইসলিং না রাজা হাকিম, যিনি সমগ্র দেশবাসীকে নাজীদের প্রতিহিংসার ক্ষুধার সামনে ফেলে রেখে নিজের অমূল্য জানটাকে বাঁচাবার জন্য পালিয়ে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছিলেন সুদুর ইংল্যান্ডে ?

 

পেজ ১৪৬- ঠিক হায় সাব, চালিয়ে, আপকো ওই হোটেলমে পঁহুছা দুঙ্গা! আর কোন আপত্তি করল না টাঙাওয়ালা। সাহেবকে নিয়ে রওয়ানা দিল দেশোওয়ালী হোটেলের পথে। হুহু করে ছুটে চলল টাঙা। বোধ হয় মিনিট দশেক লাগল না, এরই মধ্যে সেটা এসে পৌছে গেল নির্দিষ্ট হোটেলটার দরজায় । টাঙাওয়ালা বলল: বাবুজী, এহি উও হোটেল হ্যায়।’ ১৪৭- পছন্দ না হলেও যে সে ঘরে থাকাটাই তার নিজের স্বার্থের দিক থেকে জরুরী সেটা তাঁর জানাই ছিল। মিষ্টি হেসে বললেন: ‘এ তো খাসা ঘর ‘। ভদ্রলোকের কথাটি শুনে পাঠানটি মুচকি হেসে চলে গেল তার নিজের কাজে । ভদ্রলোকও তার আস্তানা বেশ গুছিয়ে বসার বাবস্থায় লেগে গেলেন।

 

কিন্ত মুশকিল হল খাবার টেবিলে। হোটেলটা সম্পূর্ণই মুসলমানি বাবস্থাপণায় পরিচালিত। তাই খাদ্য তালিকা যে মুসলমানী রুচি অনুযায়ী হবে তাতে আর আশ্চর্য কী ? টেবিলে বসতেই বেয়ারা সাজিয়ে নিয়ে এল থালা।একেবারে সাধারণ মুসলমানী খানা। ‘তন্দুরী, গাইগোস্ত, সালাদ আর ফিরনি’। সমস্যায় পড়লেন ভদ্রলোক । এখন কী করবেন? মনের মাঝে শুরু হল দ্বন্দ্ব- কোনটা আগে ? ধর্ম না দেশ ? দেশ না ধর্ম? কোনটা? বেশ কয়েকবার কথাটা ভাবলেন; বেশ কয়েকবার। অবশেষে জবাব পেলেন- পরিষ্কার জবাব। সোজাসুজি অন্তরের নির্দশ : দেশই আগে। দেশের স্বাধীনতার জন্য গো-মাংস কেন, ইঁদুরের মাংস খেতে হলেও রাজী।

 

‘সুভাষ ঘরে ফেরে নাই’ শামল বসুর লেখা অতুলনীয় বই এটি যা প্রায় সব বাঙালির চেনা। তা থেকেই উপরের অংশটি নেওয়া। ‘The Indian struggle -1920-1942’ যা নেতাজীর লেখা ও শিশির কুমার বসুর সম্পাদনা, সেই বইয়ের অনেক অংশ থেকে লেখাটিকে সমৃদ্ধ করেছি। বইটি নেতাজী রিসার্চ বুরো কলকাতা, ১৯৬৪-তে সংকলন করেছে। এশিয়া পাবলিশিং হাউস থেকে প্রকাশিত হয়েছিল। এখানে সুভাষ আরো একটি বিশেষ কথার উল্লেখ করেছেন যা প্রণিধানযোগ্য। এই বইয়ের ৪৫০ পাতায় এ আই সি সি বা অল ইন্ডিয়া কংগ্রেস কমিটির একটি বহু দামী ঘোষণার উল্লেখ করা আছে।

 

এখনে বলা হয়েছে যে, অবশেষে যখন এইইসিসি তার ভবিষ্যত স্বাধীন ভারত সরকার পরিচালনার কথা বা শাসনের কথা নিয়ে কংগ্রেসের মনোভাব খুলে বলল যে যখন একটি সাধারণ জনগণের দ্বারা সংগঠিত গণ সংগ্রামের পর মুক্ত ভারতে কংগ্রেস কোনরূপ আলাদা করে ক্ষমতা দাবী করবে না। যে ক্ষমতা এসেছে তা ভারতের সমস্ত মানুষের জন্য। সুভাষ বসুর লেখা এই কথা স্বাধীনতার পর কংগ্রেস পালন করেনি। এবারের দাবী যেহেতু জৃতীয় কংগ্রেস স্বাধীনতা এনেছে তাই তারাই একমাত্র ক্ষমতার দাবীদার যা নেতাজীর চিন্তাধারার পরিপন্থী। একটা পরিবারের কাছে সমস্ত কৃতিত্ব, সমস্ত সরকারি সুযোগ সুবিধা চলে গেছে। প্রায় পঞ্চাশ বছর তাদের পরিবারের লোকজনশাসক করেছেন। যা একটি অনাকাঙ্খিত পরিপরিবারতন্ত্রকেই প্রতিষ্ঠা দিয়েছে। শক্তিশালী করেছে।

 

নেতাজীর সেই পুর্ব ঘোষিত ভাবনাকে মুল্য দেওয়া হয়নি। ”Lastly, whilst the A.I.C.C. has stated its own view of the future governance under free India, the A.I.C.C. wishes to make it quite clear to all concerned that by embarking on a mass struggle it has no intention of gaining power for the Congress. The power when it comes, will belong to the whole people of India.” নেতাজীর লেখার অভ্যাস বরাবরই ছিল। বৃটিশের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক লড়াইয়ের সাথে সাথে তিনি প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে প্রবন্ধ লিখতেন। এবং তা ‘আজাদ হিন্দ’ পত্রিকা ছাড়াও দেশবিদেশের বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় প্রকাশিত হত।

 

যেমন তার একটি প্রবন্ধ এই বইয়ের শেষের দিকে প্রকাশিত হয়েছে- Free India and her problem ‘ দেশমাতৃকাকে ‘হার her সম্বোধন করেছেন এই প্রবন্ধে। এই বইয়ে রয়েছে আরও অনেক প্রবন্ধ যাতে তিনি স্বাধীন ভারতের শাসনবাবসথা, সেনাবাহিনী কেমন হবে সে সবকিছুর ঈঙ্গিত দিয়েছিলেন। যেমন,- নবজাগরণ, আজকের পরিস্থিতি, যখন ভারত মুক্ত হবে, একটি নতুন বেসরকারি শাসনবাবস্থা, জাতীয় সেনাবাহিনী, নতুন দেশ, জাতীয় সংহতি, সামাজিক সমস্যা, অর্থনীতি, যোজনা কমিটি, দ্য প্রিন্সেস (প্রিনস্লেস্টেট), আন্তর্জাতিক সম্পর্ক এসব নিয়ে এই বইয়ের ৪৫১-৪৫৯ পাতায় তার মতামত লিপিবদ্ধ করেছেন যার অনেকগুলো দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ভারত সরকার মেনেছে, অনেকগুলো মানেনি।

 

বইয়ে দুটি চিঠি এখানে ছাপা হয়েছে। সেখানে তিনি যে ইটালি, জাপান ও জার্মানির সঙ্গে অনবরত যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছেন তা পরিষ্কার বুঝিয়েছেন। ২য় চিঠিতে তিনি লিখেছেন উত্তর আফ্রিকা অনেক দোর, তাই সেখান থেকে মিলিটারি কাজ কারবার এগিয়ে নিয়ে যাওয়া খুব একটা কার্যকর হবে না। তিনি প্রথম চিঠিতে অডলফ হিটলারকে ‘ফুয়েরর’ বলে উল্লেখ করেছেন। যার কারণে তখন বৃটিশের পক্ষে নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে নেতাজীকে ‘কুইসলিং বা বেইমান’ বলেছে ভারতীয় কমিউনিস্টরা। জাপানের সঙ্গে নেতাজীর সুসম্পর্ক ছিল। তখনকার জাপানের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন ‘হিডেকি তোজো’। তাই ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টির নেতারা নেতাজীকে ‘তেজোর কুত্তা’ বলে গালাগাল করেছিল । ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টির নেতারা এখন সে সব ভুলে গিয়ে ভোল পাল্টে নেতাজী ভক্ত হয়ে গেছে।

আরও পড়ুন – ২৪ জানুয়ারি মুক্তি পাচ্ছে ‘ভোলা’ সিনেমার দ্বিতীয় পর্বের টিজার।

অথচ সমাজতান্ত্রিক ভাবধারার নেতাজী বইয়ের একটি জায়গায় তাঁর সাথীদের ‘কমরেড ‘ বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি জাতীয়তাবাদী হলেও তার মধ্যে সমাজতান্ত্রিক সমাজ বাবস্থার প্রতি ঝোঁক ছিল। বহুরূপে বহু আলোচনা গল্পে গুজবে রাজনীতিতে নেতাজী যে আজও কতটা প্রাসঙ্গিক তা আজকের কেন্দ্রীয় সরকার ও রাজ্য সরকারের মনোভাবে স্পষ্ট। স্পষ্ট বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাজীর প্রতিবার শ্রদ্ধা প্রদর্শন। তবে ‘কাড়াকাড়ি টানাটানি’ দৃষ্টিকটূ। এখন আর কোন তেমন জাতীয়তাবাদী স্বাধীনতা সেনানী বা কোন রাজনৈতিক নেতার সেই কারিশ্মা নেই যিনি সেই কারিশ্মা দিয়ে সারাদেশের মানুষকে প্রভাবিত করতে পারেন। জাতীয়তাবাদের শেষ এবং উজ্জ্বল পুরুষ তিনি সুভাষ চন্দ্র বসু, এক ও অদ্বিতীয়। নমস্কার। ।