আন্তর্জাতিক
বর্ণবিদ্বেষের বিরুদ্ধে লড়াই থেকে আন্তর্জাতিক আদালতে যুদ্ধাপরাধ ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিচারের দাবিতে দীর্ঘ সংগ্রাম—এ বার সেই অবদানের স্বীকৃতি পেলেন নাভানেথেম ‘নাভি’ পিল্লাই। ২০২৬ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কার পেলেন ভারতীয় তামিল বংশোদ্ভূত দক্ষিণ আফ্রিকার এই বিশিষ্ট আইনজ্ঞ। শুক্রবার নরওয়ের নোবেল কমিটি তাঁর নাম ঘোষণা করে। আন্তর্জাতিক আইনকে শক্তিশালী করা এবং যুদ্ধাপরাধ, মানবতাবিরোধী অপরাধ ও গণহত্যার বিচারের ক্ষেত্রে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করেছে কমিটি।
১৯৪১ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার ডারবানে ভারতীয় তামিল পরিবারে জন্ম নাভি পিল্লাইয়ের। বর্ণবিদ্বেষের পরিবেশে বেড়ে ওঠার অভিজ্ঞতা তাঁর পরবর্তী কর্মজীবনে গভীর প্রভাব ফেলেছিল। আইনজীবী হিসেবে তিনি দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবিদ্বেষবিরোধী আন্দোলনের কর্মীদের পাশে দাঁড়ান। ১৯৬৭ সালে নিজের আইনজীবী সংস্থা প্রতিষ্ঠা করেন তিনি। পরবর্তী সময়ে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন নিয়ে পড়াশোনা করে ১৯৮৮ সালে জুরিডিক্যাল সায়েন্সে ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন করেন।
দক্ষিণ আফ্রিকার বিচারব্যবস্থায়ও গুরুত্বপূর্ণ নজির গড়েছেন নাভি পিল্লাই। ১৯৯৫ সালে সে দেশের হাই কোর্টের বিচারপতি হিসেবে নিযুক্ত হন তিনি। পরবর্তী সময়ে রুয়ান্ডার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচারকের দায়িত্ব পালন করেন এবং পরে ওই ট্রাইব্যুনালের প্রেসিডেন্ট হন। রুয়ান্ডার গণহত্যা সংক্রান্ত ঐতিহাসিক মামলাগুলিতে তাঁর ভূমিকা আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থায় বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। যৌন হিংসা ও ধর্ষণ যে গণহত্যা এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের পর্যায়ে পড়তে পারে, সেই আইনি নীতি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও তাঁর অবদান উল্লেখযোগ্য।
২০০৮ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত রাষ্ট্রসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন নাভি পিল্লাই। এই সময় আন্তর্জাতিক স্তরে মানবাধিকার রক্ষা, বৈষম্যের বিরুদ্ধে অবস্থান এবং গুরুতর অপরাধের বিচারের দাবিতে কাজ করেন তিনি। পরে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতেও বিচারকের দায়িত্ব পালন করেন। ২০২১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত অধিকৃত প্যালেস্টাইন ভূখণ্ড সংক্রান্ত রাষ্ট্রসংঘের স্বাধীন তদন্ত কমিশনের চেয়ারম্যান ছিলেন তিনি। বর্তমানে মায়ানমারের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে চলা মামলায় অ্যাড হক বিচারক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন।
নোবেল কমিটির মতে, নাভি পিল্লাইয়ের দীর্ঘ কর্মজীবনের মূল সুর হল আন্তর্জাতিক আইন, ন্যায়বিচার এবং মানবিক মর্যাদা রক্ষার প্রতি তাঁর অবিচল অঙ্গীকার। যুদ্ধ ও সংঘাতের সময়ে ক্ষমতাশালী ব্যক্তি বা রাষ্ট্রকেও আইনের আওতায় আনার প্রয়োজনীয়তার কথা তাঁর কাজ বারবার সামনে এনেছে। আন্তর্জাতিক আইনের প্রতিষ্ঠানগুলি যখন নানা চাপের মুখে, তখন তাঁর এই স্বীকৃতি ন্যায়বিচার ও আইনের শাসনের গুরুত্বকেও নতুন করে তুলে ধরেছে।
নাভি পিল্লাইয়ের নোবেল শান্তি পুরস্কার জয় শুধু দক্ষিণ আফ্রিকার নয়, ভারতীয় বংশোদ্ভূত মানুষের কাছেও বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। বর্ণবিদ্বেষের বিরুদ্ধে লড়াই দিয়ে শুরু হওয়া তাঁর যাত্রা আজ আন্তর্জাতিক স্তরে মানবাধিকার ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের এক গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হয়ে উঠেছে।




















