নয়াদিল্লি: সাম্প্রতিক ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতির জেরে বিশ্বজুড়ে পণ্য পরিবহণ ও সরবরাহ ব্যবস্থায় একাধিক চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে সামুদ্রিক নিরাপত্তা জোরদার করা, বন্দরগুলির মধ্যে সংযোগ বৃদ্ধি এবং নির্ভরযোগ্য সাপ্লাই চেন গড়ে তোলার লক্ষ্যে আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জকে ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক ও অর্থনৈতিক প্রবেশদ্বার হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা করছে ভারত। এর মাধ্যমে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে বাণিজ্যিক যোগাযোগ আরও মজবুত করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।
‘আন্দামান ডায়লগ ২০২৭’-কে কেন্দ্র করে এই পরিকল্পনা সামনে এসেছে। আঞ্চলিক অর্থনীতি ও নিরাপত্তা সহযোগিতা নিয়ে আলোচনার জন্য ১৫টিরও বেশি দেশের কূটনীতিক, সামুদ্রিক বিশেষজ্ঞ, সরকারি আধিকারিক এবং শিল্প প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণের কথা রয়েছে এই অনুষ্ঠানে। আগামী ১২ থেকে ১৪ মার্চ আন্দামান দ্বীপপুঞ্জের স্বরাজ দ্বীপে এই আলোচনা হওয়ার কথা। ভারত মহাসাগর ও ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে সামুদ্রিক পরিকাঠামো, বাণিজ্যিক সংযোগ এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্ব শক্তিশালী করাই আলোচনার অন্যতম লক্ষ্য।
বাণিজ্য, ডিজিটাল পরিকাঠামো ও লজিস্টিকসে বিশেষ জোর
একটি রেকর্ড করা বার্তার মাধ্যমে বক্তব্য রাখতে গিয়ে কেন্দ্রীয় বাণিজ্য ও শিল্পমন্ত্রী পীযূষ গোয়েল দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে অর্থনৈতিক সেতু হিসেবে আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের সম্ভাবনার উপর গুরুত্ব দিয়েছেন বলে জানানো হয়েছে। বাণিজ্য, ডিজিটাল পরিকাঠামো, লজিস্টিকস, শিপিং এবং অর্থনৈতিক পরিষেবার ক্ষেত্রে সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পেতে পারে।
বিশ্বজুড়ে সাপ্লাই চেনে বিঘ্ন এবং দ্রুত প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে নির্ভরযোগ্য আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্ব গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তার কথাও উঠে এসেছে। পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ পরিকাঠামোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং আঞ্চলিক অর্থনীতিকে আরও স্থিতিশীল করে তোলার উপর জোর দেওয়া হয়েছে। ভারতের পরিকল্পনায় আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের ভৌগোলিক অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে সামুদ্রিক বাণিজ্য ও যোগাযোগের পরিসর বাড়ানোর বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
সামুদ্রিক সহযোগিতার রূপরেখা তুলে ধরলেন প্রাক্তন নৌসেনা প্রধান
ন্যাশনাল মেরিটাইম ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান এবং প্রাক্তন নৌসেনা প্রধান অ্যাডমিরাল দীনেশ কে. ত্রিপাঠি বঙ্গোপসাগর, ভারত মহাসাগর এবং বৃহত্তর ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ জাহাজ চলাচলের পথের কাছে আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের কৌশলগত অবস্থানের কথা তুলে ধরেছেন। বন্দরগুলির মধ্যে সংযোগ বৃদ্ধি, সামুদ্রিক নজরদারি, জাহাজ নির্মাণ, জাহাজ মেরামত এবং নাবিকদের প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়ানোর উপর গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি।
আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য নিরাপদ সমুদ্রপথ কতটা গুরুত্বপূর্ণ, সেই বিষয়টিও আলোচনায় উঠে এসেছে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলির সঙ্গে ভারতের সামুদ্রিক সম্পর্ক আরও শক্তিশালী হলে বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সহযোগিতার নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
ভারত-আসিয়ান বাণিজ্য ও সামুদ্রিক নজরদারিতে বাড়তি গুরুত্ব
অ্যাডমিরাল ত্রিপাঠির বক্তব্যে ভারত ও আসিয়ানভুক্ত দেশগুলির মধ্যে বাণিজ্যের গুরুত্বও উঠে এসেছে। ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষে ভারত-আসিয়ান বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় ১২৮ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছতে পারে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ভারতের মোট বাণিজ্যে এই অঞ্চলের অংশ প্রায় ১১ শতাংশ হতে পারে বলেও দাবি করা হয়েছে। এই বাণিজ্যিক সম্পর্ককে আরও সম্প্রসারিত করতে নিরাপদ ও কার্যকর সামুদ্রিক যোগাযোগের উপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
এ ছাড়াও, ‘ইনফরমেশন ফিউশন সেন্টার–ইন্ডিয়ান ওশান রিজিয়ন’-এর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়ানোর পরিকল্পনার কথা জানানো হয়েছে। বর্তমানে এই ব্যবস্থায় প্রায় ১৬ থেকে ১৭টি অংশীদার দেশের আধিকারিকরা যুক্ত রয়েছেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ২০২৮ সালের মধ্যে অংশীদার দেশের সংখ্যা বাড়িয়ে ৫০-এ নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্য রয়েছে।
সব মিলিয়ে, আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জকে ঘিরে ভারতের পরিকল্পনায় সামুদ্রিক নিরাপত্তা, বন্দর সংযোগ, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং আঞ্চলিক সহযোগিতা বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। পরিকল্পনাগুলি বাস্তবায়িত হলে ভারত মহাসাগর ও ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে ভারতের বাণিজ্যিক যোগাযোগ এবং সরবরাহ ব্যবস্থার সক্ষমতা আরও বাড়তে পারে।




















