অবশেষে ভারতে শুরু HPV টিকাকরণ কর্মসূচি, আট বছরের অপেক্ষা ঘিরে প্রশ্ন

অবশেষে ভারতে শুরু HPV টিকাকরণ কর্মসূচি, আট বছরের অপেক্ষা ঘিরে প্রশ্ন

Facebook
Twitter
LinkedIn
Email
WhatsApp
Print
Telegram


স্বাস্থ্য – ভারতে অবশেষে শুরু হয়েছে মানব প্যাপিলোমা ভাইরাস (HPV)-এর বিরুদ্ধে জাতীয় টিকাকরণ কর্মসূচি। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, এই কর্মসূচি চালু হতে আট বছর দেরি হওয়ায় লক্ষাধিক ভারতীয় মহিলা জরায়ুমুখের ক্যানসারে প্রাণ হারিয়েছেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, প্রতি বছর প্রায় ৭৭ হাজার মহিলা এই রোগে মৃত্যুবরণ করেন, যার প্রধান কারণ মানব প্যাপিলোমা ভাইরাস সংক্রমণ। বিশেষজ্ঞদের দাবি, ২০১৮ সালেই কর্মসূচি শুরু হলে বহু কিশোরী ভবিষ্যতের ঝুঁকি থেকে সুরক্ষিত থাকতে পারতেন।
২০১৮ সালে দেশের সর্বোচ্চ টিকানীতি নির্ধারণকারী সংস্থা National Technical Advisory Group on Immunisation (NTAGI) সুপারিশ করেছিল যে HPV টিকাকে Universal Immunisation Programme (UIP)-এর অন্তর্ভুক্ত করা উচিত। তবে তখন টিকার উচ্চ মূল্য এবং জাতীয় স্তরে বাস্তবায়নের জটিলতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। স্বাস্থ্য মন্ত্রকের এক প্রাক্তন শীর্ষ কর্মকর্তা জানান, সেই সময় মূল উদ্বেগ ছিল বহুজাতিক কোম্পানির তৈরি টিকার দাম। সরকারের ধারণা ছিল, দেশীয় টিকা এলে খরচ কমবে এবং কর্মসূচি আরও কার্যকর হবে। তাই অপেক্ষার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
এরপর ২০২২ সালে ভারতের Serum Institute of India বাজারে আনে দেশীয় HPV টিকা Cervavac, যা ‘মেড ইন ইন্ডিয়া’ সাফল্য হিসেবে প্রচারিত হয়। তবে অবশেষে জাতীয় কর্মসূচি শুরু হয়েছে অন্য একটি টিকা দিয়ে, যার নাম Gardasil। এই টিকা তৈরি করে Merck Sharp & Dohme (MSD)। কর্মসূচির জন্য ২.৬ কোটি ডোজ গার্ডাসিল সংগ্রহ করা হয়েছে, যার আর্থিক সহায়তা দিচ্ছে Gavi, the Vaccine Alliance। ফলে দেশীয় টিকার অপেক্ষা সত্ত্বেও কেন বিদেশি টিকা ব্যবহার করা হল—এই প্রশ্ন উঠেছে বিভিন্ন মহলে।
HPV টিকা নিয়ে ভারতের বিতর্ক নতুন নয়। ২০০৯ সালে অন্ধ্রপ্রদেশে একটি ট্রায়ালের সময় কয়েকজন কিশোরীর মৃত্যুর ঘটনা নিয়ে তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। পরবর্তী তদন্তে অধিকাংশ মৃত্যুর সঙ্গে টিকার সরাসরি সম্পর্ক পাওয়া যায়নি। তবু সেই ঘটনার পর সমাজে ও রাজনৈতিক মহলে টিকা নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়। এছাড়া স্বদেশী জাগরণ মঞ্চের পক্ষ থেকেও এই টিকাকে UIP-এ অন্তর্ভুক্ত করার বিরোধিতা করা হয়েছিল। সংগঠনের নেতা অশ্বিনী মহাজন টিকার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে দাবি করেছিলেন, এটি জাতীয় সম্পদের অপচয় ঘটাতে পারে।
এই বিতর্কের মধ্যেই বছরের পর বছর সিদ্ধান্ত ঝুলে থাকে। যদিও ২০১৫ সালে Gavi ভারতের বিভিন্ন টিকাকরণ প্রকল্পে সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, যার মধ্যে HPV কর্মসূচিও অন্তর্ভুক্ত ছিল। বর্তমান কর্মসূচির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল ডোজের সংখ্যা। সাধারণত HPV টিকা দুই ডোজে দেওয়া হয়, তবে ভারতে ১৪ বছর বয়সী কিশোরীদের ক্ষেত্রে এক ডোজ দেওয়ার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। যদিও বিশ্বে আনুষ্ঠানিকভাবে এক ডোজের টিকা হিসেবে এটি অনুমোদিত নয়, তবে এই বিষয়ে গবেষণা করছে Indian Council of Medical Research (ICMR)। ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে NTAGI-র বৈঠকেও বিষয়টি আলোচিত হয়।
সরকার তাদের সিদ্ধান্তের পক্ষে World Health Organization (WHO)-এর সুপারিশের উল্লেখ করেছে। WHO-এর বিশেষজ্ঞ কমিটি ২০২২ সালে জানায়, একটি ডোজও পর্যাপ্ত সুরক্ষা দিতে পারে এবং কর্মসূচি বাস্তবায়নে সুবিধা হবে। প্রাথমিক পর্যায়ে ২.৬ কোটি ডোজ গার্ডাসিল ব্যবহার করে তিন বছর কর্মসূচি চালানোর পরিকল্পনা রয়েছে। প্রতি বছর প্রায় ১.১২ কোটি কিশোরী ১৪ বছরে পা দেয়, যাদের লক্ষ্য করে টিকাকরণ করা হবে।
সরকারি সূত্রের বক্তব্য, যেহেতু টিকা সহজলভ্য ছিল এবং আন্তর্জাতিক সহায়তা মিলেছে, তাই কর্মসূচি শুরু করার সুযোগ কাজে লাগানো হয়েছে। ভবিষ্যতে দেশীয় এক-ডোজ টিকা প্রস্তুত হলে পরবর্তী ধাপে তা অন্তর্ভুক্ত করা হতে পারে। তবে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, এই আট বছরের বিলম্ব ভারতের টিকানীতির জটিল বাস্তবতা তুলে ধরেছে, যেখানে বৈজ্ঞানিক প্রমাণ, অর্থনীতি, রাজনৈতিক মতাদর্শ ও সামাজিক বিতর্ক মিলিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণে দীর্ঘ সময় লেগে যায়। আর সেই সময়ে প্রতিরোধযোগ্য রোগে বহু প্রাণহানি ঘটে।

RECOMMENDED FOR YOU.....

Scroll to Top