আলিপুরদুয়ার
গান্ধী জয়ন্তীর দিন বক্সা টাইগার রিজার্ভে নতুন অধ্যায়ের সূচনা। বিহারের বাল্মিকী টাইগার রিজার্ভ থেকে আনা প্রায় তিন বছরের একটি রয়্যাল বেঙ্গল বাঘিনীকে শুক্রবার বক্সার গভীর অরণ্যে মুক্ত করা হল। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী এবং কেন্দ্রীয় বনমন্ত্রী ভূপেন্দ্র যাদবের উপস্থিতিতে সম্পন্ন হল এই বাঘ পুনঃপ্রবর্তন কর্মসূচি। বক্সায় দীর্ঘদিন পর স্থায়ী বাঘের জনসংখ্যা ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যেই এই উদ্যোগ।
বাঘিনীকে জঙ্গলে ছাড়ার পর মুখ্যমন্ত্রী বলেন, দীর্ঘদিন নামেই ‘টাইগার রিজার্ভ’ হয়ে থাকা বক্সা এবার ফের নিজের স্বাভাবিক ছন্দে ফিরছে। তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে বক্সার জীববৈচিত্র্য পুনরুদ্ধার, বন্যপ্রাণ সংরক্ষণ এবং উত্তরবঙ্গের পর্যটন পরিকাঠামোকে আরও শক্তিশালী করার পরিকল্পনা।
বক্সায় বাঘ ফেরানোর এই উদ্যোগ অবশ্য একদিনের নয়। ২০২২ সালের সর্বভারতীয় বাঘ গণনায় বক্সায় কোনও স্থায়ী বাঘের ছবি ধরা পড়েনি। তবে ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে বক্সার দু’টি ক্যামেরা ট্র্যাপে বাঘের ছবি ধরা পড়ার কথা কেন্দ্রীয় সরকারের নথিতেও উল্লেখ রয়েছে। ভুটান ও অসমের সংলগ্ন বনাঞ্চলের সঙ্গে বক্সার যোগাযোগ থাকায় বন্যপ্রাণীর স্বাভাবিক চলাচলেরও সুযোগ রয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে বক্সায় প্রথমে একটি বাঘিনী এনে তাকে নতুন পরিবেশে মানিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। বাল্মিকী থেকে বাঘিনীটিকে বিশেষ বিমানে হাসিমারা নিয়ে আসার পর স্বাস্থ্যপরীক্ষা করে বক্সার এনক্লোজারে রাখা হয়েছিল। তার গতিবিধি সিসিটিভির মাধ্যমে নজরে রাখা হয় এবং পরে রেডিও কলার পরিয়ে তাকে জঙ্গলে ছাড়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
বন দফতরের পরিকল্পনা অনুযায়ী, এই একটি বাঘিনী দিয়েই কর্মসূচি শেষ হচ্ছে না। আগামী দিনে আরও বাঘ বক্সায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে। আধিকারিকদের বক্তব্য অনুযায়ী, আগামী দুই মাসের মধ্যে আরও তিনটি বাঘ আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর লক্ষ্য শুধু বাঘের সংখ্যা বাড়ানো নয়, বক্সার আবাসস্থল, শিকারপ্রাণীর সংখ্যা এবং সামগ্রিক বাস্তুতন্ত্রকে ধীরে ধীরে পুনরুজ্জীবিত করা।
বক্সার জঙ্গলকে কেন্দ্র করে পর্যটনকেও আরও বড় পরিসরে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনার কথা এদিন তুলে ধরেন মুখ্যমন্ত্রী। জয়ন্তী ও মানস সংলগ্ন এলাকায় বড় মাপের অরণ্য পর্যটনকেন্দ্র গড়ে তোলার পরিকল্পনা এবং হলং বনবাংলোকে আধুনিক করে তোলার কাজের কথাও জানান তিনি। বাঘের উপস্থিতি বাড়লে ডুয়ার্সে প্রকৃতি পর্যটনের ক্ষেত্রেও নতুন সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে বলে প্রশাসনের তরফে আশা করা হচ্ছে।
বন্যপ্রাণ সংরক্ষণের পাশাপাশি উত্তরবঙ্গের চা-বাগান ও স্থানীয় অর্থনীতির সঙ্গে পর্যটনকে যুক্ত করার বিষয়টিও সামনে এসেছে। বক্সাকে ঘিরে পর্যটকের সংখ্যা বাড়লে স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থান ও ব্যবসার সুযোগও বাড়তে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বাঘ পুনঃপ্রবর্তন প্রকল্পকে তাই শুধু বন সংরক্ষণের কর্মসূচি হিসেবে নয়, বৃহত্তর আঞ্চলিক উন্নয়নের সঙ্গেও যুক্ত করে দেখা হচ্ছে।
এদিন রাজাভাতখাওয়া এলাকায় স্থানীয় বাসিন্দা ও বনবস্তির মানুষের সঙ্গেও কথা বলেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁদের বিভিন্ন সমস্যার কথা শোনেন তিনি। পরে সাফারি গাড়িতে বক্সার জঙ্গলের বিভিন্ন এলাকা পরিদর্শন করেন মুখ্যমন্ত্রী। সঙ্গে ছিলেন কেন্দ্রীয় বনমন্ত্রী ভূপেন্দ্র যাদব এবং রাজ্যের বনমন্ত্রী মনোজ কুমার ওঁরাও।
বহু বছর ধরে বক্সায় স্থায়ী বাঘের অনুপস্থিতির পর বাল্মিকী থেকে আনা এই বাঘিনীকে ছেড়ে দেওয়া তাই উত্তরবঙ্গের বন্যপ্রাণ সংরক্ষণে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। এখন নজর থাকবে, নতুন পরিবেশে বাঘিনী কীভাবে মানিয়ে নেয় এবং আগামী দিনে বক্সার জঙ্গলে বাঘের একটি স্থায়ী প্রজননক্ষম জনসংখ্যা তৈরি করা সম্ভব হয় কি না।




















