মলদ্বীপ নয়, ভারতের বুকেই লুকিয়ে স্বর্গ! কম খরচে ঘুরে আসুন নীল জলের স্বপ্নরাজ্য লাক্ষাদ্বীপ

মলদ্বীপ নয়, ভারতের বুকেই লুকিয়ে স্বর্গ! কম খরচে ঘুরে আসুন নীল জলের স্বপ্নরাজ্য লাক্ষাদ্বীপ

Facebook
Twitter
LinkedIn
Email
WhatsApp
Print
Telegram


অফ বিট – একবার চোখ বন্ধ করে কল্পনা করুন—চারপাশে শুধুই নীল জল, পায়ের নিচে সাদা নরম বালি, দূরে দুলছে নারকেল গাছ আর বাতাসে ভেসে আসছে সমুদ্রের লবণাক্ত গন্ধ। মনে হতে পারে যেন আপনি মলদ্বীপের কোনও বিলাসবহুল দ্বীপে পৌঁছে গিয়েছেন। অথচ এই স্বর্গ রয়েছে ভারতের বুকেই। নাম তার লাক্ষাদ্বীপ।
বিদেশ ভ্রমণের কথা উঠলেই অনেকের প্রথম পছন্দ হয় মলদ্বীপ। নীল লেগুন, জলের উপর ভাসমান কটেজ, স্নোরকেলিং কিংবা রোম্যান্টিক সূর্যাস্ত—সব মিলিয়ে এক স্বপ্নের গন্তব্য। তবে খুব কম মানুষই জানেন, ভারতের আরব সাগরের মাঝখানে এমন এক দ্বীপপুঞ্জ রয়েছে, যা সৌন্দর্য, শান্তি এবং প্রাকৃতিক জাদুর দিক থেকে মলদ্বীপের সঙ্গে সমান তালে পাল্লা দিতে পারে। বরং অনেকের কাছে লাক্ষাদ্বীপ আরও বেশি আপন মনে হয়।
‘লাক্ষাদ্বীপ’ শব্দের অর্থ ‘এক লক্ষ দ্বীপ’। যদিও বাস্তবে এখানে রয়েছে ৩৬টি ছোট-বড় দ্বীপ। তার মধ্যে মাত্র কয়েকটি দ্বীপ পর্যটকদের জন্য খোলা। সীমিত প্রবেশের কারণেই এই দ্বীপপুঞ্জ আজও অনেকটাই অক্ষত এবং প্রকৃতির আসল রূপ ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে। ভারতের সবচেয়ে ছোট কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল হলেও সৌন্দর্যের বিচারে এর গুরুত্ব অপরিসীম।
এখানকার সমুদ্রের জল এতটাই স্বচ্ছ যে নৌকার উপর দাঁড়িয়ে নিচে মাছ সাঁতার কাটতে দেখা যায়। কখনও মনে হবে সমুদ্র যেন কাঁচ দিয়ে তৈরি। ফিরোজা নীল, হালকা সবুজ এবং গভীর সমুদ্রের নীল—সব মিলিয়ে প্রকৃতি যেন নিজের হাতে রঙ মিশিয়ে তৈরি করেছে এক অপূর্ব ক্যানভাস।
মলদ্বীপে যেতে পাসপোর্ট, আন্তর্জাতিক বিমানভাড়া এবং বিপুল খরচের প্রয়োজন হয়। কিন্তু লাক্ষাদ্বীপে যেতে সেই ঝামেলা অনেকটাই কম। ভারতীয় নাগরিকদের জন্য এটি তুলনামূলকভাবে সহজ এবং সাশ্রয়ী ভ্রমণ গন্তব্য। এখানকার সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হলো শান্ত পরিবেশ। ভিড় কম, শব্দ কম, কোলাহল কম। চাইলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সৈকতে বসে শুধুই ঢেউয়ের শব্দ শুনে কাটিয়ে দেওয়া যায়।
লাক্ষাদ্বীপের প্রতিটি দ্বীপের আলাদা সৌন্দর্য রয়েছে। বাঙ্গারাম দ্বীপকে অনেকে বলেন ‘লাক্ষাদ্বীপের রত্ন’। নরম বালির সৈকত, শান্ত সমুদ্র আর একান্ত পরিবেশ এটিকে হানিমুন কিংবা নিভৃত বিশ্রামের আদর্শ জায়গা করে তুলেছে। সূর্যাস্তের দৃশ্য এখানে যেন সিনেমার ফ্রেম।
আগাত্তি দ্বীপ লাক্ষাদ্বীপে প্রবেশের অন্যতম প্রধান দরজা। এখানকার রানওয়েকে পৃথিবীর অন্যতম সুন্দর রানওয়ে বলা হয়। বিমান নামার সময় দু’পাশে সমুদ্রের বিস্তীর্ণ নীল জল দেখে মনে হয় যেন আকাশ আর সমুদ্রের মাঝখানে ভেসে আছেন।
যারা স্কুবা ডাইভিং বা স্নোরকেলিং ভালোবাসেন, তাদের জন্য কাদমাত দ্বীপ এক স্বপ্নের জায়গা। রঙিন প্রবাল, সামুদ্রিক কচ্ছপ, ছোট ছোট মাছ আর সমুদ্রের নিচের অপূর্ব জগত পর্যটকদের মুগ্ধ করে।
প্রকৃতিপ্রেমীদের জন্য লাক্ষাদ্বীপ সত্যিই এক স্বর্গরাজ্য। এখানকার প্রবাল প্রাচীর ভারতের অন্যতম সেরা সংরক্ষিত সামুদ্রিক অঞ্চল হিসেবে পরিচিত। স্নোরকেলিং করতে গিয়ে দেখা মিলতে পারে ডলফিন, অক্টোপাস কিংবা নানা রঙের সামুদ্রিক প্রাণীর। মলদ্বীপের মতো এখানেও রয়েছে লেগুন, নৌবিহার এবং অসাধারণ সমুদ্র দৃশ্য। তবে পার্থক্য একটাই—এখানে প্রকৃতি এখনও অনেকটাই অক্ষত।
সংস্কৃতির দিক থেকেও লাক্ষাদ্বীপ অত্যন্ত সমৃদ্ধ। কেরালার সঙ্গে এখানকার সংস্কৃতির গভীর যোগ রয়েছে। স্থানীয় মানুষজন মালয়ালম ভাষায় কথা বলেন। খাবারে নারকেলের ব্যবহার স্পষ্ট। টাটকা সামুদ্রিক খাবার, নারকেল-ভিত্তিক রান্না এবং আন্তরিক আতিথেয়তা পর্যটকদের আলাদা অভিজ্ঞতা দেয়।
ভবিষ্যতে লাক্ষাদ্বীপ ভ্রমণ আরও সহজ হতে চলেছে ভারতের প্রথম বাণিজ্যিক সি-প্লেন পরিষেবার মাধ্যমে। নতুন এই উদ্যোগ চালু হলে দ্বীপগুলির মধ্যে যাতায়াত দ্রুত এবং সুবিধাজনক হবে। বিশেষ করে কম সময়ে একাধিক দ্বীপ ঘুরতে চাইলে এই পরিষেবা বড় সুবিধা এনে দেবে।
সম্প্রতি পর্যটকদের জন্য অনুমতি প্রক্রিয়াও সহজ করা হয়েছে। আগে স্থানীয় পৃষ্ঠপোষকের প্রয়োজন হলেও এখন সেই বাধ্যবাধকতা অনেকটাই কমেছে। তবে লাক্ষাদ্বীপ ভ্রমণের আগে অনলাইনে পারমিট নেওয়া বাধ্যতামূলক। পরিবেশ রক্ষার স্বার্থে সীমিত সংখ্যক পর্যটককে অনুমতি দেওয়া হয়।
খরচের দিক থেকেও লাক্ষাদ্বীপ মলদ্বীপের তুলনায় অনেকটাই সাশ্রয়ী। এক মাস আগে বিমানের টিকিট বুক করলে যাওয়া-আসার খরচ মাথাপিছু সাধারণত ১২ হাজার টাকার সামান্য বেশি হয়। রিসর্টে থাকতে প্রতিদিন ২ হাজার থেকে ৭ হাজার টাকা পর্যন্ত খরচ হতে পারে। খাবারের জন্য দৈনিক ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা এবং স্থানীয় ঘোরাঘুরি ও নৌবিহারে অতিরিক্ত ১,৫০০ থেকে ২,০০০ টাকা খরচ হতে পারে। সব মিলিয়ে এক দম্পতির প্রতিদিন গড় খরচ দাঁড়ায় প্রায় ৭,০০০ থেকে ৭,৫০০ টাকা।
অন্যদিকে মলদ্বীপে শুধু বিমানভাড়াই ২৫ হাজার থেকে ৩৫ হাজার টাকার মধ্যে হতে পারে। মাঝারি মানের রিসর্ট, খাবার এবং অন্যান্য খরচ মিলিয়ে এক দম্পতির দৈনিক ব্যয় প্রায় ১৭,৫০০ থেকে ১৮,০০০ টাকা পর্যন্ত পৌঁছে যায়।
যদি আপনি কোলাহলমুক্ত, প্রকৃতির কাছাকাছি, শান্ত এবং তুলনামূলকভাবে কম খরচের কোনও সমুদ্রভ্রমণের খোঁজে থাকেন, তাহলে লাক্ষাদ্বীপ হতে পারে আদর্শ গন্তব্য। এখানে সমুদ্র শুধু দেখার বিষয় নয়, অনুভব করার বিষয়। এখানে সূর্যাস্ত শুধু ক্যামেরাবন্দি করার জন্য নয়, নিজের সঙ্গে কিছুটা সময় কাটানোর উপলক্ষ।
লাক্ষাদ্বীপ শুধুই একটি পর্যটন কেন্দ্র নয়, এটি এক অনুভূতি। এমন এক জায়গা, যেখানে সময় ধীরে চলে, মন শান্ত হয় এবং প্রকৃতির সঙ্গে সম্পর্ক নতুন করে তৈরি হয়। তাই পরের বার দ্বীপ ভ্রমণের পরিকল্পনা করলে বিদেশের দিকে তাকানোর আগে একবার লাক্ষাদ্বীপকে ভাবতেই পারেন। হয়তো বুঝতে পারবেন—স্বর্গ সবসময় দূরে থাকে না, কখনও কখনও তা নিজের দেশেই লুকিয়ে থাকে।

RECOMMENDED FOR YOU.....

Scroll to Top