দিল্লি – দিল্লির লুটিয়েন্স জোনের বুক থেকে এবার হারিয়ে যেতে চলেছে আভিজাত্য, ইতিহাস এবং ব্রিটিশ আমলের এক গুরুত্বপূর্ণ স্মৃতি। জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে ঐতিহ্যবাহী Delhi Gymkhana Club-এর লিজ বাতিল করল কেন্দ্রীয় সরকার। আগামী ৫ জুনের মধ্যে ক্লাব প্রাঙ্গণ খালি করে দেওয়ার জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছে কর্তৃপক্ষকে।
২ নম্বর সফদরজং রোডে অবস্থিত প্রায় ২৭.৩ একর বিস্তীর্ণ জমির মালিকানা এবার সরাসরি রাষ্ট্রপতির হাতে ফিরিয়ে দেওয়া হবে বলে জানিয়েছে কেন্দ্র। প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন Lok Kalyan Marg-এর খুব কাছেই অবস্থিত এই ক্লাব দীর্ঘদিন ধরে দেশের ভিভিআইপি, আমলা এবং উচ্চবিত্তদের অন্যতম সামাজিক কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত ছিল।
কেন্দ্রীয় আবাসন ও নগরোন্নয়ন মন্ত্রকের অধীনস্থ জমি ও উন্নয়ন দফতর বা এলঅ্যান্ডডিও জানিয়েছে, ক্লাবটির অবস্থান অত্যন্ত সংবেদনশীল ও কৌশলগত এলাকায় হওয়ায় প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তার স্বার্থেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
গত ২২ মে পাঠানো সরকারি নোটিসে স্পষ্ট জানানো হয়েছে, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে জমি হস্তান্তর না হলে ক্লাব কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে কড়া আইনি পদক্ষেপ করা হবে। মূল লিজ চুক্তির ৪ নম্বর ধারা প্রয়োগ করেই এই ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে কেন্দ্রীয় সরকার।
এই জিমখানা ক্লাবের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে ব্রিটিশ ভারতের দীর্ঘ ইতিহাস। ১৯১১ সালে রাজা পঞ্চম জর্জ যখন ভারতের রাজধানী কলকাতা থেকে দিল্লিতে স্থানান্তরের ঘোষণা করেন, তখন ব্রিটিশ সাহেবদের জন্য একটি রাজকীয় ক্লাব তৈরির ভাবনা শুরু হয়। সেই পরিকল্পনার ফল হিসেবেই ১৯১৩ সালে পথচলা শুরু করে ‘ইম্পেরিয়াল দিল্লি জিমখানা ক্লাব’।
১৯৩০-এর দশকে এই ক্লাবের মূল ভবনের নির্মাণ সম্পন্ন করেন প্রখ্যাত ব্রিটিশ স্থপতি Robert Tor Russell। তিনিই দিল্লির বিখ্যাত Connaught Place এবং Teen Murti Bhavan-এর নকশাও তৈরি করেছিলেন। শতবর্ষ পার হলেও ক্লাবের মূল স্থাপত্যে কোনও বড় পরিবর্তন আনা হয়নি।
এমনকি ১৯৩০-এর দশকে ক্লাবের আধুনিক সুইমিং পুল নির্মাণের জন্য তৎকালীন ভাইসরয়ের পত্নী লেডি উইলিংটন নিজে ২১ হাজার টাকা অনুদান দিয়েছিলেন বলেও জানা যায়।
কেবল আভিজাত্যের কেন্দ্র নয়, এই ক্লাব সাক্ষী থেকেছে দেশভাগের বেদনাময় ইতিহাসেরও। ১৯৪৭ সালে ভারত-পাকিস্তান বিভাজনের সময় এই ক্লাবের লনেই শেষবারের মতো একে অপরকে বিদায় জানিয়েছিলেন হিন্দু, মুসলিম ও শিখ রেজিমেন্টের সেনা অফিসারেরা।
প্রখ্যাত লেখক Khushwant Singh, যিনি এই ক্লাবের আজীবন সদস্য ছিলেন, একসময় ক্লাবের বিলাসবহুল জীবনযাপন নিয়ে কটাক্ষ করে লিখেছিলেন— “রামে জারিত, পাপী, জিনে-রসে পরিপূর্ণ, রামে ভেজা পুরুষ ও মহিলা!”
আগামী ৫ জুনের পর হয়তো আর দেখা যাবে না সেই ঐতিহাসিক আভিজাত্যের চেনা কোলাহল। ইতিহাস, স্থাপত্য এবং জাতীয় নিরাপত্তার সংযোগস্থলে দাঁড়িয়ে এক নতুন অধ্যায়ের সাক্ষী হতে চলেছে দেশের রাজধানী।




















