বিদেশ – মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের দেওয়া সাম্প্রতিক প্রস্তাব গ্রহণ করবেন না বলেই কূটনৈতিক মহলে ধারণা তৈরি হয়েছে। পশ্চিম এশিয়ায় চলমান সংঘাত কমাতে তেহরান একাধিক শর্তসহ একটি সমাধানসূত্র সামনে এনেছে, তবে ওয়াশিংটনের অবস্থান তাতে সায় দিচ্ছে না বলেই জানা যাচ্ছে।
মার্কিন প্রশাসনের সূত্রে দাবি করা হয়েছে, ইরান প্রথমে যুদ্ধবিরতি এবং হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা সংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তি চায়, এরপর তারা পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনায় বসতে আগ্রহী। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান ঠিক উল্টো—তাদের মতে, যেকোনও দীর্ঘমেয়াদি সমঝোতার কেন্দ্রবিন্দু হতে হবে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, এবং সেই বিষয়েই প্রথমে আলোচনা প্রয়োজন।
ইরানের প্রস্তাবে তিনটি ধাপ উল্লেখ করা হয়েছে। প্রথম ধাপে মার্কিন-ইজরায়েলি হামলা বন্ধ এবং ভবিষ্যতে হামলা না চালানোর নিশ্চয়তা চাওয়া হয়েছে। দ্বিতীয় ধাপে মার্কিন নৌ অবরোধ প্রত্যাহার এবং গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ, বিশেষ করে হরমুজ প্রণালিতে স্বাভাবিক বাণিজ্যিক চলাচল পুনরুদ্ধারের দাবি রয়েছে। তৃতীয় ধাপে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণসহ পারমাণবিক কর্মসূচির অধিকার নিয়ে আলোচনার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
তবে মার্কিন বিদেশমন্ত্রী মার্কো রুবিও স্পষ্ট জানিয়েছেন, কোনও চুক্তির মূল শর্ত হতে হবে ইরান যেন কখনও পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির দিকে না এগোয়। তাঁর বক্তব্য, ইরানকে কোনওভাবেই ছাড় দেওয়া যাবে না এবং আলোচনার শুরু থেকেই পারমাণবিক ইস্যু কেন্দ্রীয় বিষয় হওয়া উচিত।
এই অবস্থানের কারণে কূটনৈতিক আলোচনার পথ আরও জটিল হয়ে উঠেছে। ইসলামাবাদে নির্ধারিত বৈঠকও বাতিল হয়েছে বলে জানা যাচ্ছে, কারণ ট্রাম্প তাঁর বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং উপদেষ্টা জ্যারেড কুশনারের সফর স্থগিত করেন।
এরই মধ্যে ইরানের বিদেশমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি পাকিস্তান, ওমান ও রাশিয়া সফর করেছেন এবং মস্কোয় প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। রাশিয়া দীর্ঘদিন ধরেই ইরানের গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক মিত্র হিসেবে পরিচিত।
অন্যদিকে, জাতিসংঘের এনপিটি সম্মেলনকে ঘিরেও নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। ইরানকে সহ-সভাপতি হিসেবে মনোনীত করা হলেও যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানি, অস্ট্রেলিয়া ও সংযুক্ত আরব আমিরশাহির মতো দেশ এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেছে। ওয়াশিংটনের দাবি, চুক্তি লঙ্ঘনকারী একটি দেশকে এমন গুরুত্বপূর্ণ পদে রাখা উদ্বেগজনক।
এছাড়া হরমুজ প্রণালি ঘিরে উত্তেজনা আরও বেড়েছে। বহু দেশ এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ খুলে দেওয়ার আহ্বান জানালেও ইরান অভিযোগ করছে, তাদের তেলবাহী জাহাজ সেখানে বাধার মুখে পড়ছে। বিশ্ব তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ যেহেতু এই পথ দিয়ে যায়, তাই পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক অর্থনীতিতেও প্রভাব ফেলছে।
সংঘাতের আগে যেখানে প্রতিদিন শতাধিক জাহাজ হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচল করত, এখন সেই সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। ফলে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ও বাণিজ্য প্রবাহেও চাপ তৈরি হয়েছে।
সব মিলিয়ে ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের এই টানাপোড়েন এখন কেবল কূটনৈতিক নয়, বরং আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক নিরাপত্তার দিক থেকেও অত্যন্ত সংবেদনশীল পরিস্থিতি তৈরি করেছে।




















