রাজ্য – সময়ের সঙ্গে রাজনীতির সমীকরণ বদলায় ঠিকই, তবে পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে যা ঘটল, তা কার্যত নজিরবিহীন বলেই মনে করছে রাজনৈতিক মহলের একাংশ। তৃণমূল কংগ্রেসের বহিষ্কৃত মুখপাত্র ঋজু দত্ত এমন কিছু মন্তব্য করেছেন, যা রাজ্যের রাজনৈতিক মহলে তীব্র আলোড়ন তৈরি করেছে। একদিকে তিনি বিজেপির মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর ভূয়সী প্রশংসা করেছেন, অন্যদিকে তৃণমূল কংগ্রেসের অন্দরের একাধিক দুর্বলতাও প্রকাশ্যে তুলে ধরেছেন।
এক আন্তর্জাতিক সংবাদসংস্থাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ঋজু দত্ত দাবি করেন, গত ৬ মে শুভেন্দু অধিকারীর ব্যক্তিগত সহকারীর খুনের ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাজ্যে যখন উত্তেজনা চরমে পৌঁছেছিল, তখন শুভেন্দুর সংযমী অবস্থানই বড় ধরনের রক্তপাত আটকায়। তাঁর কথায়, “সেদিন রাতে শুভেন্দু যদি প্রতিশোধের ডাক দিতেন, তাহলে সারা বাংলায় রক্তপাত অনিবার্য ছিল। কিন্তু তিনি শান্ত থাকার আবেদন করেছিলেন। সেই কারণেই অন্তত পাঁচ হাজার তৃণমূল কর্মীর প্রাণ বেঁচেছে।”
ঋজুর এই মন্তব্য প্রকাশ্যে আসতেই রাজনৈতিক মহলে শুরু হয়েছে জোর বিতর্ক। বিশেষ করে তৃণমূল শিবিরে তা যথেষ্ট অস্বস্তির কারণ হয়ে উঠেছে বলে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মত।
এখানেই থেমে থাকেননি বহিষ্কৃত এই নেতা। তিনি সরাসরি দাবি করেন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পর পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার জন্য সবচেয়ে যোগ্য ব্যক্তি শুভেন্দু অধিকারী। সাংসদ, মন্ত্রী এবং নন্দীগ্রামে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে পরাজিত করার অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, শুভেন্দু বর্তমানে দেশের প্রথম সারির রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যে অন্যতম।
একইসঙ্গে তৃণমূলের অন্দরের ক্ষোভ এবং সাংগঠনিক দুর্বলতার দিকেও আঙুল তুলেছেন ঋজু দত্ত। তাঁর অভিযোগ, ভোটকুশলী সংস্থা ‘আই-প্যাক’-এর উপর অতিরিক্ত নির্ভরতার ফলে দলের নিজস্ব সাংগঠনিক কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়েছে। নেতৃত্বের সঙ্গে কর্মীদের যোগাযোগ কমেছে এবং দল কার্যত বাইরের সংস্থার নিয়ন্ত্রণে চলে গিয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।
উল্লেখ্য, গত ৪ মে প্রকাশিত বিধানসভা নির্বাচনের ফলে ২০৭টি আসন জিতে বাংলায় প্রথমবার ক্ষমতায় আসে বিজেপি। অন্যদিকে তৃণমূল কংগ্রেস পায় ৮০টি আসন। ফল প্রকাশের পর থেকেই দলের ভরাডুবি নিয়ে তৃণমূলের অন্দরে প্রশ্ন উঠতে শুরু করে। প্রাক্তন মন্ত্রী মনোজ তিওয়ারি, কলকাতার ডেপুটি মেয়র অতীন ঘোষ, প্রবীণ নেতা কৃষ্ণেন্দু নারায়ণ চৌধুরী এবং প্রার্থী রত্না চট্টোপাধ্যায়-সহ একাধিক নেতা প্রকাশ্যে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন।
বিশেষ করে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক কৌশল এবং দুর্নীতির অভিযোগ ঘিরে দলের ভিতরে যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছিল, ঋজু দত্তের সাম্প্রতিক মন্তব্য সেই বিতর্ককে আরও উসকে দিল বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহল।
তৃণমূল কংগ্রেস অবশ্য এই মন্তব্যকে বিশেষ গুরুত্ব দিতে নারাজ। দলের তরফে জানানো হয়েছে, ঋজু দত্তের বক্তব্য সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত এবং এর সঙ্গে দলের কোনও সম্পর্ক নেই। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই মন্তব্য আসলে তৃণমূলের অভ্যন্তরীণ সংকট এবং ক্রমবর্ধমান অস্বস্তিরই বহিঃপ্রকাশ।




















