রাজ্য – রাজ্যের চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশের পরই নতুন বিতর্কের সূচনা হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী প্রায় ৬০ লক্ষ ভোটারের নাম ‘আন্ডার অ্যাজুডিকেশন’ বা ‘বিচারাধীন’ তালিকায় রাখা হয়েছে। এই তালিকায় সবচেয়ে বেশি নাম রয়েছে সংখ্যালঘু অধ্যুষিত পাঁচ জেলা—মুর্শিদাবাদ, মালদা, উত্তর ২৪ পরগণা, দক্ষিণ ২৪ পরগণা এবং উত্তর দিনাজপুরে। বিষয়টি সামনে আসতেই রাজ্যের রাজনৈতিক মহলে শুরু হয়েছে তীব্র আলোড়ন।
নতুন ভোটার তালিকার প্রভাব নিয়ে একদিকে রাজনৈতিক দলগুলি হিসাব-নিকাশ শুরু করেছে, অন্যদিকে নাগরিক সমাজের একাংশ ‘বিচারাধীন’ ভোটারদের অধিকার রক্ষার দাবিতে সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি সংগঠন গড়ে তুলেছেন। সেই সংগঠনের নাম রাখা হয়েছে ‘সারা বাংলা বিচারাধীন ভোটার মঞ্চ’। এই মঞ্চের পক্ষ থেকে আগামী ৭ মার্চ কলকাতায় টি-বোর্ড থেকে রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকের দপ্তর পর্যন্ত পদযাত্রার ডাক দেওয়া হয়েছে। সংগঠনের দাবি, লক্ষ লক্ষ ভোটারকে ‘বিচারাধীন’ বা ‘বাতিল’ অবস্থায় রেখে কোনওভাবেই আসন্ন বিধানসভা নির্বাচন করা উচিত নয়।
প্রতিবাদ কর্মসূচির পাশাপাশি সংগঠনটি জেলাভিত্তিক স্বেচ্ছাসেবক দল গঠনের কাজও শুরু করেছে। তারা চূড়ান্ত ভোটার তালিকা খতিয়ে দেখে নির্বাচন কমিশনের কাজে কোথাও অসঙ্গতি রয়েছে কি না তা খুঁজে বের করার উদ্যোগ নিয়েছে। পাশাপাশি ‘বিচারাধীন’ তালিকায় থাকা ভোটারদের আইনি সহায়তা দেওয়ার জন্য একটি পৃথক আইনি সেল তৈরি করা হয়েছে। বিভিন্ন জেলার বুথ লেভেল অফিসারদের সঙ্গে যোগাযোগ করে ‘অ্যাজুডিকেশন’-এর আওতায় থাকা নামগুলির তথ্য সংগ্রহের কাজও চলছে।
চিত্রশিল্পী তোসিফ হক, অধ্যাপক সফিউল আলম মল্লিকসহ কয়েকজনের উদ্যোগে এই ফোরামের সূচনা হলেও অল্প সময়ের মধ্যেই এর সদস্যসংখ্যা দ্রুত বেড়েছে। মাত্র দু’দিনের মধ্যেই এক হাজারেরও বেশি মানুষ এতে যুক্ত হয়েছেন। অনলাইন বৈঠকের মাধ্যমে জেলা ভিত্তিক গ্রুপ তৈরি করে তথ্য সংগ্রহের কাজও শুরু হয়েছে। এই মঞ্চে শিক্ষক, অধ্যাপক, শিল্পী, আইনজীবী, লেখক, সমাজকর্মী, মানবাধিকারকর্মী, সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার থেকে শুরু করে পরিযায়ী শ্রমিক পর্যন্ত নানা পেশার মানুষ যুক্ত হয়েছেন।
এরই মধ্যে ভোটার তালিকা ঘিরে কয়েকটি অভিযোগও সামনে এসেছে। সম্প্রতি কলকাতার ৮৯ নম্বর ওয়ার্ডের চারু মার্কেট এলাকার একটি বুথে এক মহিলা বিজেপি সমর্থকের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে যে তিনি প্রায় ৪০ জনের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার জন্য ফর্ম–৭ জমা দিয়েছেন। এই অভিযোগের ভিত্তিতে স্থানীয় বাসিন্দারা চারু মার্কেট থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। খড়দহ বিধানসভা এলাকাতেও একই ধরনের অভিযোগ সামনে আসে। যদিও পরে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপে শেষ পর্যন্ত কারও নাম তালিকা থেকে বাদ পড়েনি।
এই ঘটনাগুলির প্রসঙ্গ তুলে মঞ্চের অন্যতম আহ্বায়ক এবং তথ্যচিত্র নির্মাতা কস্তুরী বসু বলেন, এই ধরনের ঘটনা সামনে না এলে বিষয়টি সাধারণ মানুষের নজরে আসত না। ফর্ম–৭ ব্যবহার করে কত বৈধ ভোটারের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে বা বাদ দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে, তা এখনও স্পষ্ট নয়। অন্য রাজ্যেও একই ধরনের অভিযোগ উঠেছে বলেও তিনি দাবি করেন। তিনি সাধারণ মানুষকে অনুরোধ করেন, কোথাও যদি এ ধরনের অভিযোগ থাকে তাহলে তা মঞ্চকে জানাতে।
মঞ্চের সদস্যরা জানান, শুধু ‘বিচারাধীন’ নয়, অন্যায়ভাবে তালিকা থেকে বাদ পড়া ভোটারদের অধিকার রক্ষার জন্যও তারা কাজ করবেন। ধর্ম, জাতি বা রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে সকলের ভোটাধিকার নিশ্চিত করাই তাদের মূল লক্ষ্য। এই ইস্যুতে বিজেপি-বিরোধী রাজনৈতিক দল ও সংগঠনগুলিকেও একসঙ্গে এগিয়ে আসার আহ্বান জানানো হয়েছে। মঞ্চের আর এক আহ্বায়ক এবং পেশায় অধ্যাপিকা আফরোজা খাতুন বলেন, এখন দলীয় রাজনীতির সময় নয়, মানুষের ভোটাধিকার রক্ষা করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
অন্যদিকে সমস্ত ‘বিচারাধীন’ ভোটারকে ভোটদানের অধিকার দেওয়ার দাবিতে গত মাসে গঠিত ‘সংগ্রামী গণমঞ্চ’ও আন্দোলনে নেমেছে। সংগঠনের পক্ষ থেকে বৃহস্পতিবার কলকাতায় মিছিল করে রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক এবং কলকাতা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতির কাছে স্মারকলিপি জমা দেওয়ার কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে।



















