রাজ্য – শনিবার ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডের ঐতিহাসিক শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানে এক আবেগঘন মুহূর্তের সাক্ষী থাকল বাংলা। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি নিজে গায়ে শাল জড়িয়ে সম্মান জানালেন ৯৭ বছর বয়সী প্রবীণ বিজেপি কর্মী মাখনলাল সরকারকে। শুধু তাই নয়, তাঁর পায়ে হাত দিয়ে প্রণামও করেন প্রধানমন্ত্রী। এরপরই রাজনৈতিক মহল থেকে সাধারণ মানুষের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠেন শিলিগুড়ির সূর্য নগরের এই প্রচারবিমুখ প্রবীণ সংগঠক।
এতদিন সাধারণ পোশাকের শীর্ণকায় মানুষ হিসেবেই তাঁকে চিনতেন এলাকার বাসিন্দারা। কিন্তু শনিবারের ঘটনার পর অনেকেই নতুন করে জানতে পারলেন, বিজেপির পূর্বসূরি জনসঙ্ঘের সময় থেকেই সংগঠনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছেন মাখনলাল সরকার। দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের নানা গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়েরও সাক্ষী তিনি।
জানা যায়, জনসঙ্ঘের প্রতিষ্ঠাতা ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের অন্যতম সহযোগী ছিলেন মাখনলালবাবু। কাশ্মীর আন্দোলনেও তাঁর সঙ্গে অংশ নিয়েছিলেন তিনি। পঞ্চাশের দশকে দেশাত্মবোধক গান গাওয়ার অভিযোগে দিল্লি পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার করেছিল বলেও জানা যায়। আদালতে নিয়ে গিয়ে ক্ষমা চাইতে বলা হলেও তিনি তাতে রাজি হননি।
রাজনৈতিক মহলে তাঁর গুরুত্ব কতটা ছিল, তার প্রমাণ মিলেছে অতীতেও। প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী অটলবিহারি বাজপেয়ী থেকে শুরু করে লালকৃষ্ণ আডবাণী— সকলেই তাঁকে চিনতেন এবং শিলিগুড়িতে এলে দেখা করতেন। দলের নেতা-কর্মীদের থাকা ও খাওয়ার ব্যবস্থার দায়িত্বও বহু বছর নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন মাখনলাল সরকার। নিজের অর্থ খরচ করেই সেই দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি।
শনিবার বাড়িতে বসে টেলিভিশনে শপথগ্রহণ অনুষ্ঠান দেখছিলেন তাঁর স্ত্রী পুতুল দেবী। প্রধানমন্ত্রীকে নিজের স্বামীকে আলিঙ্গন করতে দেখে আবেগে ভেঙে পড়েন তিনি। স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে জানান, বছরের পর বছর সংসারের অভাব-অনটনের মধ্যেও দলীয় কাজ থেকে কখনও সরে আসেননি মাখনলালবাবু। এমনকি দলীয় কর্মীদের জন্য রান্নাবান্নার দায়িত্বও সামলাতেন তিনি নিজে। পুতুল দেবীর কথায়, “মানুষ এতটা সৎ, দল-অন্তপ্রাণ এবং প্রচারবিমুখ হতে পারে, ওর সঙ্গে সংসার না করলে বুঝতেই পারতাম না।”
এই প্রবীণ কর্মীকে সম্মান জানিয়ে সমাজমাধ্যমেও পোস্ট করেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। তিনি লেখেন, মাখনলাল সরকার একজন নিবেদিতপ্রাণ জাতীয়তাবাদী মানুষ, যিনি শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে কাজ করেছেন এবং জম্মু-কাশ্মীর আন্দোলনে অংশ নিয়ে গ্রেপ্তারও হয়েছেন। বিজেপির সংগঠন বিস্তারে তাঁর অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলেও উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী।
শুধু মোদিই নন, এদিন মাখনলাল সরকারকে প্রণাম করেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ এবং নবনিযুক্ত মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীও। বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য মঞ্চ থেকেই তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের পরিচয় তুলে ধরেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ব্রিগেডের মঞ্চে এই সম্মান শুধু একজন প্রবীণ কর্মীকেই নয়, বরং সংগঠনের প্রতি আজীবন নিষ্ঠা ও ত্যাগের রাজনীতিকেও তুলে ধরল।



















