কলকাতা – কলকাতার পার্ক সার্কাস ও পার্ক স্ট্রিটের গলিতে ফুটবল ও ক্রিকেট খেলেই বড় হয়ে ওঠা লিয়েন্ডার পেজের জীবনের পথচলা সহজ ছিল না। বেঙ্গল চেম্বার্স অফ কমার্সের এক অনুষ্ঠানে নিজের সংগ্রামের নানা অজানা অধ্যায় তুলে ধরেন ভারতের প্রাক্তন টেনিস তারকা। তিনি জানান, মাত্র ১৯ বছর বয়সে নিউইয়র্কে আর্থিক সংকটের কারণে পার্ক করা ট্রেনের কামরায় রাত কাটাতে হয়েছে তাঁকে। মাথার উপর ছাদ ছিল না, কিন্তু স্বপ্ন ছিল অটুট।
লিয়েন্ডার বলেন, একবার ডাকাতদের হাতে আক্রান্ত হয়ে বুকে ২৩টি সেলাই পড়েছিল। টেনিসের জুতো কেড়ে নিতে এলে তিনি প্রতিরোধ করেছিলেন। সেই ক্ষতচিহ্ন প্রতিদিন তাঁকে মনে করিয়ে দিত, জীবনের প্রতিটি লড়াই শেষ পর্যন্ত জিততেই হবে। তাঁর কথায়, কোর্টের বাইরের সেই সংগ্রামই তাঁকে উইম্বলডন ও ফরাসি ওপেনের মতো বড় মঞ্চে লড়াই করার মানসিক শক্তি দিয়েছিল।
নিজের পরিবার, বিশেষ করে বাবা ভেস পেজের অবদানের কথাও তুলে ধরেন তিনি। অলিম্পিকজয়ী হকি খেলোয়াড় এবং ক্রীড়া-বিজ্ঞান বিশেষজ্ঞ ভেস পেজ প্রতিভা বিকাশ ও খেলোয়াড় তৈরির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। তবে লিয়েন্ডার জানান, তাঁর প্রথম ভালোবাসা ছিল ফুটবল। তবুও ভারতীয়রাও বিশ্বমানের টেনিস খেলতে পারে—এই বিশ্বাস প্রতিষ্ঠা করার লক্ষ্যেই তিনি টেনিসকে পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন।
বিশ্ব টেনিসে ভারতীয়দের নিয়ে যে ধারণা ছিল, তা বদলে দেওয়াই ছিল তাঁর অন্যতম লক্ষ্য। লিয়েন্ডারের মতে, একসময় অনেক বিদেশি প্রতিপক্ষ মনে করতেন, উন্নয়নশীল দেশের খেলোয়াড়রা চাপের মুখে ভেঙে পড়বেন। সেই ধারণাকে ভুল প্রমাণ করাই ছিল তাঁর ব্যক্তিগত চ্যালেঞ্জ।
অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, আর্থিক কষ্ট বা শারীরিক আঘাতের থেকেও বড় প্রেরণা ছিল আন্তর্জাতিক মঞ্চে ভারতের তেরঙ্গা উড়তে দেখা। তাঁর কথায়, টেনিস তাঁর প্যাশন হলেও দেশের পতাকাকে বিশ্বমঞ্চে উড়তে দেখার অনুভূতি তার থেকেও বড়।
বাংলার ক্রীড়া পরিকাঠামো নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন লিয়েন্ডার পেজ। তিনি বলেন, বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গ থেকে জাতীয় স্তরে দেশের প্রতিনিধিত্ব করছেন এমন খেলোয়াড়ের সংখ্যা খুবই কম, যা তাঁর কাছে উদ্বেগের বিষয়। আগামী দিনে রাজ্যে ক্রীড়ার উন্নয়ন, আধুনিক পরিকাঠামো গড়ে তোলা এবং নতুন প্রতিভা তৈরি করার ওপর জোর দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি। তাঁর আশা, আগামী দুই দশকে পশ্চিমবঙ্গ আবারও দেশের অন্যতম ক্রীড়াশক্তি হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে পারবে।
বক্তব্যের শুরুতে স্বামী বিবেকানন্দের উক্তি—‘সমস্ত শক্তি আমাদের মধ্যেই আছে’—উদ্ধৃত করে লিয়েন্ডার বলেন, তাঁর নিজের জীবনই সেই কথার বাস্তব উদাহরণ। কঠিন সংগ্রাম পেরিয়ে বিশ্বসেরার মঞ্চে পৌঁছানোর অভিজ্ঞতা থেকেই তিনি বাংলার তরুণ প্রজন্মকে স্বপ্ন দেখতে এবং সেই স্বপ্ন পূরণের জন্য নিরলস পরিশ্রম করার আহ্বান জানান।




















