কলকাতা – পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর রাজনৈতিক পরিস্থিতি যখন ক্রমশ উত্তপ্ত, ঠিক সেই সময় বৃহস্পতিবার বিকেলে কলকাতার কালীঘাটে পৌঁছলেন সমাজবাদী পার্টির প্রধান অখিলেশ যাদব। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাসভবনে তাঁর এই সফর ঘিরে রাজনৈতিক মহলে শুরু হয়েছে জোর চর্চা। সৌজন্য সাক্ষাতের গণ্ডি পেরিয়ে এই বৈঠক কার্যত বিজেপি ও নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে বিরোধী ঐক্যের বার্তা হিসেবেই উঠে এসেছে।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে দীর্ঘ বৈঠকের পর সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে অখিলেশ যাদব তীব্র আক্রমণ শানান। তাঁর দাবি, “পশ্চিমবঙ্গে কোনও সাধারণ নির্বাচন হয়নি, হয়েছে বহুস্তরীয় মাফিয়াগিরি।” বিজেপি, নির্বাচন কমিশন এবং প্রশাসনের একাংশ একযোগে কাজ করে বাংলার জনমতকে প্রভাবিত করেছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
কালীঘাটে পৌঁছনোর পর এক আবেগঘন মুহূর্তও ধরা পড়ে। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় নিজে বাড়ির দরজায় দাঁড়িয়ে অখিলেশকে অভ্যর্থনা জানান। গাড়ি থেকে নেমেই তাঁকে জড়িয়ে ধরেন সমাজবাদী পার্টি প্রধান। সূত্রের খবর, অভিষেককে উদ্দেশ্য করে অখিলেশ বলেন, “তুমি দারুণ লড়েছ।”
বৈঠকের ভিতরেও ছিল আবেগ ও রাজনৈতিক বার্তার মিশেল। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নাকি বলেন, “আমরা তো হেরে গিয়েছি।” উত্তরে অখিলেশের জবাব ছিল, “না দিদি, আপনারা হারেননি। পুরো ভোট লুটে নেওয়া হয়েছে।”
সাংবাদিক বৈঠকে অখিলেশ আরও দাবি করেন, সরকারি আধিকারিকদের ভয় দেখিয়ে অথবা সুবিধাজনক পোস্টিংয়ের প্রলোভন দেখিয়ে নির্বাচনে প্রভাব খাটানো হয়েছে। তাঁর কথায়, “বুলেটের মুখে দাঁড়িয়ে লড়াই করেছেন আপনারা। দিদি নিরাশ হওয়ার মানুষ নন, তিনি লড়াকু।”
বিজেপিকে আক্রমণ করে তিনি বলেন, দলটি “পুরুষতান্ত্রিক ও সামন্ততান্ত্রিক” মানসিকতার প্রতিনিধিত্ব করে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় একজন মহিলা নেতা বলেই তাঁকে পরিকল্পিতভাবে নিশানা করা হয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
কালীঘাটের বৈঠকে মধ্যমগ্রামের চন্দ্রনাথ রথ হত্যাকাণ্ডের প্রসঙ্গও উঠে আসে। অখিলেশ প্রশ্ন তোলেন, বিরোধী দলনেতার ঘনিষ্ঠ সহযোগী যদি নিরাপদ না হন, তাহলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। এই ঘটনায় কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীরও দায় রয়েছে বলে ইঙ্গিত দেন তিনি।
এছাড়াও গণনাকেন্দ্রের সিসিটিভি ফুটেজ প্রকাশ্যে আনার দাবিতে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পাশে দাঁড়ান অখিলেশ যাদব। নির্বাচনী প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি পূর্ণাঙ্গ তদন্তের দাবি জানান।
রাজনৈতিক মহলে বিশেষভাবে নজর কেড়েছে অখিলেশ যাদবের আরেকটি সিদ্ধান্তও। ভোটকুশলী সংস্থা ‘আই-প্যাক’-এর সঙ্গে সমাজবাদী পার্টির চুক্তি বাতিল করেছে তাঁর দল। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, পশ্চিমবঙ্গ ও তামিলনাড়ুতে প্রত্যাশিত ফল না পাওয়ার পরই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। উত্তরপ্রদেশের আগামী নির্বাচনের আগে এই পদক্ষেপ যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ বলেই মনে করা হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, কালীঘাটের এই বৈঠক শুধু নির্বাচনী পরাজয় নিয়ে আলোচনা নয়, বরং আগামী লোকসভা নির্বাচনের আগে ‘ইন্ডিয়া’ জোটকে আরও সক্রিয় ও ঐক্যবদ্ধ করার রাজনৈতিক বার্তাও বহন করছে। বিরোধী শিবির যে নতুন করে সংগঠিত হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে, অখিলেশের এই সফর সেই ইঙ্গিতই দিল।




















