কলকাতা – কলকাতার অন্যতম পরিচিত রাস্তা সোহরাওয়ার্দী অ্যাভিনিউয়ের নাম পরিবর্তন করে ‘গোপাল মুখার্জি রোড’ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কলকাতা পুরসভা। পার্ক সার্কাস এলাকা থেকে কসাইপাড়া লেন পর্যন্ত বিস্তৃত এই গুরুত্বপূর্ণ রাস্তার নতুন নামকরণ করা হয়েছে পশ্চিমবঙ্গ দিবস উপলক্ষে। রবিবার আন্তর্জাতিক যোগ দিবসের দিন বিষয়টি প্রকাশ্যে আসতেই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে বিশেষ বার্তা দেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী।
সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রকাশিত বার্তায় মুখ্যমন্ত্রী বলেন, এটি শুধুমাত্র একটি রাস্তার নাম পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নয়, বরং ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ সংশোধন। তাঁর বক্তব্য, অতীতে যে নাম বিতর্ক ও বিভাজনের স্মৃতির সঙ্গে জড়িয়ে ছিল, তার পরিবর্তে সাহস, আত্মত্যাগ এবং সমাজরক্ষার প্রতীক হিসেবে পরিচিত গোপাল মুখার্জিকে সম্মান জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে তিনি বাংলার প্রকৃত ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বদের স্মরণ ও তাঁদের অবদানকে যথাযোগ্য মর্যাদা দেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথাও উল্লেখ করেন।
ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী, গোপাল মুখার্জি কলকাতার কলেজ স্ট্রিট এলাকায় একটি মাংসের দোকান পরিচালনা করতেন। সেই সূত্রেই তিনি সাধারণ মানুষের কাছে ‘গোপাল পাঁঠা’ নামে পরিচিতি লাভ করেন। পরবর্তীকালে তিনি কলকাতার রাজনৈতিক ও সামাজিক ইতিহাসে এক উল্লেখযোগ্য চরিত্র হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠেন।
১৯৪৬ সালের ‘গ্রেট ক্যালকাটা কিলিং’-এর সময় তিনি ‘ভারত জাতীয় বাহিনী’ নামে একটি সশস্ত্র সংগঠন গঠন করেছিলেন বলে ইতিহাসে উল্লেখ রয়েছে। সেই অশান্ত সময়ে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা এবং প্রতিরোধ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা নিয়ে বিভিন্ন ঐতিহাসিক আলোচনা রয়েছে। সমর্থকদের মতে, তিনি সংকটের সময়ে বহু মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন।
১৯১৩ সালের ৭ সেপ্টেম্বর কলকাতার বৌবাজারের মলঙ্গা লেনে জন্মগ্রহণ করেন গোপাল মুখার্জি। তিনি স্বাধীনতা সংগ্রামী ও বিপ্লবী অনুকূলচন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের আত্মীয় ছিলেন। ছোটবেলা থেকেই নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর আদর্শে প্রভাবিত ছিলেন বলে জানা যায়। ব্যবসার পাশাপাশি শরীরচর্চা ও কুস্তির প্রতিও তাঁর বিশেষ আগ্রহ ছিল।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তী সময়ে তিনি ও তাঁর সহযোগীরা কিছু আগ্নেয়াস্ত্র সংগ্রহ করেছিলেন বলে বিভিন্ন ঐতিহাসিক সূত্রে উল্লেখ রয়েছে। পরবর্তীকালে অশান্ত সময়ের বিভিন্ন পরিস্থিতিতে সেই অস্ত্র ব্যবহৃত হয়েছিল বলেও দাবি করা হয়।
তবে তাঁর জীবন ও কর্মকাণ্ডকে ঘিরে মতভেদও রয়েছে। ইতিহাসবিদদের একাংশের মতে, তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান এবং কার্যকলাপ নিয়ে বিভিন্ন সময়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। বিশেষ করে অহিংস আন্দোলনের প্রবক্তা মহাত্মা গান্ধীর আদর্শের সঙ্গে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গির মিল ছিল না বলেও বহু আলোচনায় উঠে এসেছে।
জীবনের শেষ পর্যায়ে সমাজসেবামূলক কাজে নিজেকে নিয়োজিত করেন গোপাল মুখার্জি। দুঃস্থ ও অসহায় মানুষের সাহায্যের জন্য তিনি ‘ন্যাশনাল রিলিফ সেন্টার’ নামে একটি উদ্যোগ শুরু করেছিলেন। ২০০৫ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি কলকাতার বৌবাজারে নিজ বাসভবনে তাঁর মৃত্যু হয়।
রাস্তার নাম পরিবর্তনের এই সিদ্ধান্তকে ঘিরে ইতিমধ্যেই রাজনৈতিক ও সামাজিক মহলে নানা প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। একাংশ এই পদক্ষেপকে ঐতিহাসিক স্বীকৃতি হিসেবে দেখছেন, অন্যদিকে ইতিহাসের বিভিন্ন দিক নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। ফলে ‘গোপাল মুখার্জি রোড’ নামকরণ আগামী দিনে আরও বিতর্ক ও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।



















