রাজ্য – তৃণমূল কংগ্রেসে ভাঙনের ইঙ্গিত ক্রমশ স্পষ্ট হচ্ছে। একের পর এক জনপ্রতিনিধির পদত্যাগ, দলের নীতি নিয়ে প্রকাশ্য সমালোচনা এবং দুই প্রবীণ সাংসদের সংঘাতে এখন সরগরম রাজ্য রাজনীতি। বোরো চেয়ারম্যানের পদ থেকে ইস্তফা দিয়েছেন তৃণমূল কাউন্সিলর সুশান্ত ঘোষ। অন্যদিকে পুরসভার অ্যাকাউন্টস কমিটি থেকে পদত্যাগের পর এবার দলের মুখপাত্রের পদ ছাড়ার ইচ্ছা প্রকাশ করে চিঠি দিয়েছেন আর এক কাউন্সিলর অরূপ চক্রবর্তী।
এই জোড়া ইস্তফার পরই দলের একাংশের বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন শ্রীরামপুরের তৃণমূল সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়। বুধবার সুশান্ত ঘোষ এবং অরূপ চক্রবর্তীর পদত্যাগের পর তাঁদের আক্রমণ করতে গিয়ে তিনি দলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় এবং ভোটকুশলী সংস্থা ‘আইপ্যাক’-কে সরাসরি কাঠগড়ায় তোলেন।
কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের অভিযোগ, “সব ২০১১-র পর থেকে বড় বড় নেতা হয়েছে। আর এদের বড় নেতা করার জন্য অভিষেকই দায়ী। মুখপাত্র হয়ে গিয়েছে, জেলায় জেলায় ঘুরে শুধু বক্তৃতা দিয়ে এসেছে। কিন্তু সাংগঠনিক দিকটা কেউ দেখেনি। আমাদের দলের অবজার্ভার প্রথা তুলে দিয়ে আইপ্যাক নিয়ে এসে দলটাকে আজ এই জায়গায় দাঁড় করানো হয়েছে।”
দলের অভ্যন্তরীণ সংঘাত এবার সংসদ ভবন পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছে। ব্যক্তিগত আক্রমণ ও দুর্নীতির অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগের আবহে এবার কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে সরাসরি আইনি ও সংসদীয় পদক্ষেপের পথে হাঁটলেন বারাসতের সাংসদ কাকলি ঘোষ দস্তিদার। লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লাকে চিঠি লিখে কল্যাণের বিরুদ্ধে অভিযোগ জানানোর অনুমতি চেয়েছেন তিনি।
ভোটের পর কালীঘাটের পর্যালোচনা বৈঠকে লোকসভার চিফ হুইপ পদ থেকে কাকলিকে সরিয়ে দেওয়া হয়। তাঁর পরিবর্তে সেই দায়িত্ব ফের দেওয়া হয় কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়কে। এরপরই ক্ষুব্ধ কাকলি ঘোষ দস্তিদার বারাসত সাংগঠনিক জেলার সভাপতি, মহিলা তৃণমূলের সভানেত্রী এবং ওয়ার্কিং কমিটির সদস্যপদ-সহ দলের সমস্ত পদ থেকে ইস্তফা দেন।
স্পিকারকে লেখা চিঠিতে কাকলি অভিযোগ করেছেন, লোকসভার ভেতরে কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় বারবার তাঁকে কটূক্তি করেছেন। তাঁর দাবি, এই ধরনের নারীবিদ্বেষী আচরণ শুধু তাঁর সঙ্গেই নয়, হাউসের আরও বহু মহিলা সদস্যের প্রতিও করা হয়েছে এবং এর উপযুক্ত শাস্তি হওয়া প্রয়োজন।
এই অভিযোগ প্রকাশ্যে আসতেই পাল্টা আক্রমণ শানাতে দেরি করেননি কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়। পুরনো নারদাকাণ্ড টেনে তিনি কাকলি ঘোষ দস্তিদারকে নিশানা করে বলেন, “চিফ হুইপ পদ থেকে সরিয়ে আমাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বলেই ওঁর এত রাগ। হাউসে ওঁর উপস্থিতিই খুব কম ছিল। নারদা মামলায় উনি ৫ লক্ষ টাকা নিয়েছিলেন। সিবিআই চার্জশিট দিয়ে স্পিকারের কাছে ব্যবস্থা নেওয়ার অনুমতি চেয়েছিল। আমিও এবার স্পিকারকে চিঠি লিখব— কেন ওঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না?”
সব মিলিয়ে, তৃণমূলের অন্দরের দ্বন্দ্ব এখন প্রকাশ্যে চলে এসেছে। একের পর এক ইস্তফা, শীর্ষ নেতৃত্বকে ঘিরে ক্ষোভ এবং সাংসদদের পারস্পরিক আক্রমণে রাজ্যের শাসকদলের অন্দরমহলে চাপা অস্থিরতা যে ক্রমশ বাড়ছে, তা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে শুরু হয়েছে জোর আলোচনা।




















