কলকাতা – বিধানসভা নির্বাচনের পর রাজনৈতিক অস্থিরতার আবহে কলকাতা পুরসভাকে ঘিরে অনিশ্চয়তা ক্রমশ বাড়ছে। একদিকে দলীয় সংগঠনের অভ্যন্তরীণ টানাপড়েন, অন্যদিকে পুর প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে নেতৃত্ব পরিবর্তনের জল্পনা—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠেছে। এই আবহেই কলকাতা হাইকোর্টের নির্দেশ মেনে আগামী ১৯ জুন কলকাতা পুরসভার অধিবেশন ডাকার ঘোষণা করেছেন পুরসভার চেয়ারপার্সন মালা রায়।
বৃহস্পতিবার বিষয়টি নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে মুখ খোলেন দক্ষিণ কলকাতার সাংসদ তথা কলকাতা পুরসভার চেয়ারপার্সন মালা রায়। তিনি জানান, পূর্বনির্ধারিত অধিবেশন বাতিল হয়ে যাওয়ার পর আইন অনুযায়ী নতুন করে সভা ডাকার ক্ষমতা চেয়ারপার্সনের হাতে ন্যস্ত থাকে। সেই সাংবিধানিক ও প্রশাসনিক ক্ষমতা প্রয়োগ করেই আগামী ১৯ জুন পুরসভার অধিবেশন ডাকা হয়েছে। পাশাপাশি আদালতের নির্দেশনাও সংশ্লিষ্ট সমস্ত পক্ষের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে বলে তিনি জানান।
মালা রায়ের বক্তব্য অনুযায়ী, কলকাতা হাইকোর্ট স্পষ্টভাবে নির্দেশ দিয়েছে যে পুরসভার সভা আয়োজনের ক্ষেত্রে নির্ধারিত আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে। সেই নির্দেশ মেনেই নতুন তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে। তিনি আশ্বাস দেন যে নির্ধারিত দিনেই অধিবেশন অনুষ্ঠিত হবে এবং সমস্ত প্রক্রিয়া আইন মেনেই সম্পন্ন করা হবে।
পুর প্রশাসনের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন করা হলে চেয়ারপার্সন জানান, তিনি ১৯৮০ সালের কলকাতা পুর আইন অনুসরণ করেই কাজ করছেন এবং ভবিষ্যতেও সেই আইন মেনেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। আইনের বাইরে গিয়ে কোনও পদক্ষেপ নেওয়ার প্রশ্নই নেই বলে স্পষ্ট করে দেন তিনি।
মেয়র পদ নিয়ে চলা জল্পনা সম্পর্কেও প্রতিক্রিয়া দিয়েছেন মালা রায়। তিনি বলেন, এখনও পর্যন্ত তাঁর কাছে কোনও পদত্যাগপত্র জমা পড়েনি। ভবিষ্যতে যদি এমন কোনও নথি আসে, তবে তা যথাযথ নিয়ম মেনেই জনসমক্ষে জানানো হবে।
সাম্প্রতিক সময়ে কলকাতা পুরসভার একাধিক কাউন্সিলরকে ঘিরে ওঠা অভিযোগ এবং গ্রেফতারির ঘটনাও রাজনৈতিক মহলে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। তবে এ বিষয়ে মন্তব্য করতে নারাজ মালা রায়। তাঁর বক্তব্য, তদন্ত এবং আইনি প্রক্রিয়া চলমান থাকায় তিনি এই বিষয়ে কোনও মন্তব্য করতে চান না।
উল্লেখযোগ্যভাবে, গত ২২ মে কলকাতা পুরসভার ইতিহাসে এক ব্যতিক্রমী পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল। ওই দিন নির্ধারিত পুর অধিবেশন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা থাকলেও সভাকক্ষের দরজা বন্ধ থাকায় বহু কাউন্সিলর ভিতরে প্রবেশ করতে পারেননি। ফলে নির্ধারিত স্থানে সভা আয়োজন করা সম্ভব হয়নি।
পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে কিছু সময় অপেক্ষার পর মালা রায় এবং উপস্থিত কাউন্সিলররা সভাকক্ষের বাইরে বিকল্পভাবে বৈঠক করেন। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে ব্যাপক বিতর্কের সৃষ্টি হয় এবং পরবর্তীতে বিষয়টি আদালতের দোরগোড়ায় পৌঁছে যায়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচনের পরবর্তী পরিস্থিতিতে কলকাতা পুরসভার স্বাভাবিক প্রশাসনিক কার্যক্রম বজায় রাখা এখন অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। সেই কারণেই ১৯ জুনের অধিবেশনকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। ওই সভায় পুর প্রশাসনের ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা, বিভিন্ন প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত এবং বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রভাব নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
এদিকে কলকাতা পুরসভার প্রশাসনিক কাজকর্ম পরিচালনা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই অসন্তোষ প্রকাশ করেছিলেন ফিরহাদ হাকিম। প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বিভিন্ন বাধা ও জটিলতার সম্মুখীন হতে হচ্ছিল বলে তাঁর ঘনিষ্ঠ মহলের দাবি। সেই কারণেই তিনি দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি চেয়ে দলের শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে আলোচনা করেছিলেন বলে রাজনৈতিক সূত্রে জানা গিয়েছে। তাঁর মর্যাদা এবং রাজনৈতিক অবস্থান বিবেচনা করেই দলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর ইস্তফার ইচ্ছাকে সম্মান জানিয়েছেন বলেও রাজনৈতিক মহলে আলোচনা চলছে।
এখন সকলের নজর আগামী ১৯ জুনের অধিবেশনের দিকে। কারণ এই বৈঠক শুধু প্রশাসনিক নয়, কলকাতা পুরসভার ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক সমীকরণ নির্ধারণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।




















