কলকাতা -;কলকাতা পুরসভার ইতিহাসে কার্যত নজিরবিহীন ঘটনা। প্রশাসনিক প্রধান বনাম নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির সংঘাত এবার পৌঁছে গেল থানার দোরগোড়ায়। কলকাতা পুরসভার কমিশনার স্মিতা পাণ্ডের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, আইনি প্রক্রিয়া লঙ্ঘন এবং সাংবিধানিক রীতি ভাঙার অভিযোগে সরাসরি থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করলেন পুরসভার চেয়ারপার্সন তথা বিদায়ী সাংসদ মালা রায়। একইসঙ্গে অভিযোগের নিশানায় রয়েছেন পুরসভার সচিবও।
শুক্রবার রাতে নিউ মার্কেট থানায় গিয়ে এই চাঞ্চল্যকর অভিযোগপত্র জমা দেন মালা রায়। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে কলকাতা পুর প্রশাসনের অন্দরে তীব্র চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে। চেয়ারপার্সনের দাবি, কমিশনার স্মিতা পাণ্ডে এবং পুর সচিবের বিরুদ্ধে ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতা (BNSS) এবং ভারতীয় ন্যায় সংহিতা (BNS)-এর প্রাসঙ্গিক ধারায় মামলা রুজু করা হোক।
অভিযোগপত্রে মালা রায় জানিয়েছেন, কলকাতা পুরসভার ১৯৮০ সালের আইনের ৯৪ নম্বর ধারা অনুযায়ী প্রতি মাসে অন্তত একবার নির্বাচিত কাউন্সিলরদের নিয়ে মাসিক অধিবেশন বা হাউস ডাকা বাধ্যতামূলক। আইন অনুসারে এই অধিবেশন ডাকার সম্পূর্ণ ক্ষমতা ও অধিকার চেয়ারপার্সনের হাতেই ন্যস্ত।
মালা রায়ের অভিযোগ, চলতি মাসের ২২ মে শুক্রবার দুপুর ২টোর সময় তাঁর নির্দেশেই পুরসভার ৫৪তম মাসিক অধিবেশন ডাকা হয়েছিল। মে মাস শেষ হওয়ার আগে আইনি বাধ্যবাধকতা পূরণের জন্য এই বৈঠক অত্যন্ত জরুরি ছিল। কিন্তু তাঁর অভিযোগ, চেয়ারপার্সনের স্পষ্ট নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও পুর সচিব এবং পুর কমিশনার ‘অনিবার্য কারণ’ দেখিয়ে বেআইনিভাবে ওই অধিবেশন স্থগিত করে দেন।
চেয়ারপার্সনের দাবি, পুর কমিশনার নিজের ক্ষমতার সীমা অতিক্রম করে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তাঁর অভিযোগ, ইচ্ছাকৃতভাবে চেয়ারপার্সনের নির্দেশকে উপেক্ষা করে পুর প্রশাসনের মধ্যে সমান্তরালভাবে হাউস পরিচালনার চেষ্টা চলছে, যা প্রতিষ্ঠিত প্রশাসনিক নিয়মের সম্পূর্ণ বিরোধী।
নিউ মার্কেট থানার ওসি-কে দেওয়া অভিযোগপত্রে মালা রায় কড়া ভাষায় লিখেছেন, “পুর কমিশনার ও পুর সচিবের এই যৌথ পদক্ষেপ কলকাতা পুরসভার কার্যপ্রণালীর মধ্যে এক গভীর সাংবিধানিক ও প্রশাসনিক সংকট তৈরি করেছে। আইনি প্রক্রিয়াকে পাশ কাটিয়ে এই ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া গুরুতর অপরাধ এবং এর ফলে নাগরিক পরিষেবাও ব্যাহত হচ্ছে।”
নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের ক্ষমতার উপর আমলাতান্ত্রিক হস্তক্ষেপকে ‘স্বৈরাচারী, অনৈতিক ও অসাংবিধানিক’ বলেও আখ্যা দিয়েছেন তিনি। তাঁর মতে, এই ধরনের আচরণ গণতান্ত্রিক কাঠামোকে দুর্বল করছে এবং পুর প্রশাসনের মধ্যে একটি অস্বাস্থ্যকর নজির তৈরি করছে।
পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, শুক্রবার রাত প্রায় ৮টা নাগাদ নিউ মার্কেট থানা মালা রায়ের লিখিত অভিযোগ গ্রহণ করেছে। এই ঘটনায় তিনি পুলিশের কাছে চার দফা দাবি জানিয়েছেন।
চেয়ারপার্সনের দাবি, অবিলম্বে এই অভিযোগকে এফআইআর হিসেবে নথিভুক্ত করতে হবে। পাশাপাশি অভিযুক্ত আধিকারিকদের বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ তদন্ত শুরু করারও আর্জি জানিয়েছেন তিনি। এছাড়া হাউস ডাকা সংক্রান্ত সমস্ত সরকারি নথি, চিঠিপত্র ও নির্দেশিকা খতিয়ে দেখার দাবি জানানো হয়েছে। তদন্তে যদি ক্ষমতার অপব্যবহার বা দায়িত্ব পালনে গাফিলতির প্রমাণ মেলে, তাহলে সংশ্লিষ্ট আধিকারিকদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ারও আবেদন করেছেন মালা রায়।
চেয়ারপার্সন জানিয়েছেন, তদন্তে তিনি পুলিশকে পূর্ণ সহযোগিতা করবেন এবং প্রয়োজনীয় সমস্ত নথিপত্র তুলে দেবেন। এখন নজর, কলকাতা পুরসভার এই নজিরবিহীন প্রশাসনিক সংঘাত আগামী দিনে কোন দিকে মোড় নেয়।


















