রাজ্য – রাজ্যে রাজনৈতিক পালাবদলের পর থেকেই রেল স্টেশন চত্বর এবং সংলগ্ন এলাকাগুলিতে বেআইনি দখলমুক্তির অভিযানকে কেন্দ্র করে বিতর্ক ক্রমশ বাড়ছে। হাওড়া ও শিয়ালদহের পর এবার দমদম স্টেশন চত্বরেও হকার উচ্ছেদ অভিযান ঘিরে রাজনৈতিক চাপানউতোর তীব্র আকার নিয়েছে। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিজেপি সরকারের বিরুদ্ধে সরব হয়েছে তৃণমূল কংগ্রেস। সামাজিক মাধ্যমে একটি ভিডিও প্রকাশ করে উচ্ছেদ অভিযানের সমালোচনা করেছে বিরোধী দল।
তৃণমূলের অভিযোগ, প্রশাসনের এই পদক্ষেপের ফলে বহু ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, হকার এবং তাঁদের পরিবারের জীবিকা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দলের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে দমদম স্টেশন সংলগ্ন এলাকায় ছোট ব্যবসা করে সংসার চালিয়ে আসা বহু মানুষ আজ চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছেন। উচ্ছেদ অভিযানে বহু দোকান ভেঙে ফেলা হয়েছে এবং বহু মানুষের উপার্জনের একমাত্র পথ বন্ধ হয়ে গিয়েছে বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।
সামাজিক মাধ্যমে তৃণমূল প্রশ্ন তুলেছে, যাঁদের ব্যবসা ও জীবিকা নষ্ট হয়ে গেল, তাঁদের ভবিষ্যতের দায় কে নেবে? প্রতিদিনের আয়ের উপর নির্ভর করে যাঁরা সংসার চালাতেন, তাঁদের জন্য কোনও বিকল্প পুনর্বাসন বা কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা হয়েছে কি না, সেই প্রশ্নও তুলেছে দল। সাধারণ মানুষের রুজি-রোজগারের বিষয়টি উপেক্ষা করে কেন উচ্ছেদকেই একমাত্র সমাধান হিসেবে বেছে নেওয়া হচ্ছে, তা নিয়েও সরকারের সমালোচনা করা হয়েছে।
বিরোধী শিবিরের দাবি, সমাজের সবচেয়ে আর্থিকভাবে দুর্বল অংশের মানুষের ওপরই প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ছে। তাঁদের মতে, সাধারণ মানুষের স্বার্থ ও জীবিকার সুরক্ষার বদলে রাজনৈতিক বার্তা দেওয়ার উদ্দেশ্যেই এই ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। সেই কারণেই ক্ষতিগ্রস্ত হকার ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের পাশে দাঁড়িয়ে সরকারকে কাঠগড়ায় তুলেছে তৃণমূল।
অন্যদিকে প্রশাসনের অবস্থান সম্পূর্ণ ভিন্ন। রেল কর্তৃপক্ষের দাবি, দীর্ঘদিন ধরেই স্টেশন চত্বরকে বেআইনি দখলমুক্ত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল। যাত্রীদের নিরাপত্তা, স্টেশনের স্বাভাবিক চলাচল এবং পরিকাঠামোগত উন্নয়নের স্বার্থে এই অভিযান চালানো হচ্ছে। সেই কর্মসূচির অংশ হিসেবেই প্রথমে শিয়ালদহ ও হাওড়া স্টেশন এলাকায় উচ্ছেদ অভিযান চালানো হয়। পরে একই ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হয় যাদবপুর এবং দমদম স্টেশন সংলগ্ন এলাকাতেও।
প্রশাসনিক সূত্রে জানা গিয়েছে, দমদমে উচ্ছেদ অভিযানের আগে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী ও হকারদের উদ্দেশে নোটিস জারি করা হয়েছিল। নোটিস প্রকাশের পর থেকেই ব্যবসায়ীদের মধ্যে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ে। জীবিকা হারানোর আশঙ্কায় তাঁরা বিভিন্ন মহলে আবেদন জানান এবং বিষয়টি নিয়ে একাধিক শ্রমিক ও ব্যবসায়ী সংগঠন আলোচনাও করে।
এই বৈঠকগুলিতে তৃণমূল কংগ্রেস এবং বামপন্থী শ্রমিক সংগঠনের প্রতিনিধিরাও অংশ নিয়েছিলেন বলে জানা গিয়েছে। তবে সেই সমস্ত প্রচেষ্টা সত্ত্বেও শেষ পর্যন্ত উচ্ছেদ অভিযান বন্ধ করা সম্ভব হয়নি। ফলে বহু হকার ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা আরও গভীর হয়েছে।
একদিকে প্রশাসন ও রেল কর্তৃপক্ষ স্টেশন এলাকা দখলমুক্ত করার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরছে, অন্যদিকে বিরোধীরা জীবিকা ও পুনর্বাসনের প্রশ্নকে সামনে এনে আন্দোলনের সুর চড়াচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে দমদমে হকার উচ্ছেদ ইস্যু এখন শুধু প্রশাসনিক নয়, রাজনৈতিক বিতর্কেরও অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, আগামী দিনে এই ইস্যুকে কেন্দ্র করে আন্দোলন আরও তীব্র হতে পারে। স্টেশন চত্বর দখলমুক্ত করার সরকারি উদ্যোগ এবং ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জীবিকার প্রশ্ন—এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য কীভাবে রক্ষা করা হয়, সেটাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।



















