রাজ্য – মোহনবাগানের ইতিহাসে স্বপন সাধন বোস, অর্থাৎ সকলের প্রিয় ‘টুটু বোস’-এর নাম চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। সবুজ-মেরুনের এই কিংবদন্তি ক্রীড়া সংগঠক গত ১২ মে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর প্রয়াণের পর থেকেই শোকের ছায়া নেমে আসে বাংলার ক্রীড়াজগতে। সেই প্রিয় টুটু বোসের স্মৃতির উদ্দেশে সোমবার কলকাতার নেতাজি ইন্ডোর স্টেডিয়ামে আয়োজিত হয় এক বৃহৎ স্মরণসভা, যেখানে উপস্থিত ছিলেন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ, প্রাক্তন ফুটবলার, ক্রীড়া সংগঠক এবং অসংখ্য ক্রীড়াপ্রেমী মানুষ।
স্মরণসভায় টুটু বোসের অবদান ও ব্যক্তিত্বের নানা দিক তুলে ধরেন উপস্থিত বক্তারা। রাজ্যের ক্রীড়ামন্ত্রী নিশীথ প্রামাণিক, প্রবীণ বাম নেতা বিমান বসু, বিজেপি নেতা স্বপন দাশগুপ্ত এবং বর্ষীয়ান রাজনীতিক তাপস রায় সহ একাধিক বিশিষ্ট ব্যক্তি তাঁকে শ্রদ্ধা জানান। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন মোহনবাগানের বর্তমান ও প্রাক্তন কর্তারাও।
মোহনবাগান ক্লাবের বর্তমান সচিব দেবাশিস দত্ত বক্তব্য রাখতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। তিনি বলেন, টুটু বোস শুধু একজন প্রশাসক ছিলেন না, তিনি ছিলেন মোহনবাগানের প্রাণপুরুষ। তাঁর হাত ধরেই নিজের ক্লাব প্রশাসনে আসা এবং দীর্ঘদিন একসঙ্গে কাজ করার স্মৃতিচারণা করেন দেবাশিস। তিনি জানান, টুটু বোসের সদস্যপদ নম্বরটি চিরকালের জন্য সংরক্ষিত রাখা হবে এবং ভবিষ্যতে আর কাউকে সেই নম্বর দেওয়া হবে না। এই ঘোষণার পর উপস্থিত সদস্য ও সমর্থকদের মধ্যে আবেগঘন পরিবেশ তৈরি হয়।
টুটু বোসের পুত্র সৃঞ্জয় বোসও বাবার স্মৃতিচারণা করতে গিয়ে বলেন, বাবার হাত ধরেই তাঁর মোহনবাগানের সঙ্গে পথচলা শুরু হয়েছিল। তিনি জানান, পরিবারের পক্ষ থেকে তাঁরা বাবার আদর্শ, মূল্যবোধ এবং ক্লাবের প্রতি তাঁর দায়বদ্ধতাকে ভবিষ্যতেও অটুট রাখার চেষ্টা করবেন। একইসঙ্গে তিনি বলেন, মানুষের ভালোবাসাই একজন ক্রীড়া সংগঠক হিসেবে তাঁর বাবার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।
স্মরণসভায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে স্বপন দাশগুপ্ত বলেন, মোহনবাগান শুধু একটি ক্লাব নয়, এটি বাঙালির আবেগ ও ঐতিহ্যের অংশ। তিনি ক্রীড়াক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত পরিবেশ বজায় রাখার প্রয়োজনীয়তার উপর জোর দেন। একই সুর শোনা যায় তাপস রায়ের বক্তব্যেও। তিনি টুটু বোসের সহজ-সরল, আড্ডাপ্রিয় ও উদার মানসিকতার কথা স্মরণ করেন।
প্রবীণ বাম নেতা বিমান বসু বলেন, টুটু বোস কখনও সম্পর্ককে রাজনৈতিক রঙে দেখতেন না। বিভিন্ন মতাদর্শের মানুষের সঙ্গে তাঁর আন্তরিক সম্পর্ক ছিল এবং খেলাধুলাকে তিনি সবসময় রাজনীতির ঊর্ধ্বে রাখার চেষ্টা করেছেন। তাঁর এই মানসিকতা আগামী প্রজন্মের কাছে অনুকরণীয় হয়ে থাকবে বলে মত প্রকাশ করেন বিমান বসু।
অনুষ্ঠানের শেষ পর্বে ক্রীড়ামন্ত্রী নিশীথ প্রামাণিক বলেন, টুটু বোস ছিলেন বাংলার ক্রীড়াজগতের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। খেলোয়াড়দের পাশে দাঁড়ানো থেকে শুরু করে ময়দানের ঐতিহ্য রক্ষায় তাঁর ভূমিকা ছিল অনন্য। তিনি আরও বলেন, টুটু বোসের আদর্শকে সামনে রেখেই আগামী দিনে বাংলার ক্রীড়াক্ষেত্রকে আরও শক্তিশালী ও রাজনীতি মুক্ত করার প্রচেষ্টা চালানো হবে।
নেতাজি ইন্ডোর স্টেডিয়ামের এই স্মরণসভা কার্যত এক আবেগঘন মিলনমেলায় পরিণত হয়, যেখানে রাজনৈতিক বিভাজন ভুলে সবাই একত্রিত হয়ে শ্রদ্ধা জানালেন বাংলার ক্রীড়া জগতের এক অবিস্মরণীয় ব্যক্তিত্বকে।




















