রাজ্য – রাজ্যের রাজনৈতিক পালাবদলের পর আজকের বাজেটকে ঘিরে তৈরি হয়েছে ব্যাপক কৌতূহল। শুধু বাংলা নয়, দেশের বিভিন্ন মহলও নজর রাখছে রাজ্যের নতুন সরকারের প্রথম পূর্ণাঙ্গ অর্থনৈতিক রূপরেখার দিকে। বেলা ১২টায় বিধানসভায় বাজেট পেশ করবেন রাজ্যের অর্থমন্ত্রী ড. স্বপন দাশগুপ্ত। এই বাজেটেই স্পষ্ট হতে পারে আগামী দিনে রাজ্যের উন্নয়ন, কর্মসংস্থান, শিল্পায়ন এবং সামাজিক কল্যাণমূলক প্রকল্প নিয়ে সরকারের পরিকল্পনা।
কয়েকদিন আগেই মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী দাবি করেছিলেন, তাঁর সরকারের প্রথম বাজেট হবে বিশেষ গুরুত্ববহ এবং রাজ্যের প্রতিটি প্রান্তের উন্নয়নের রূপরেখা সেখানে তুলে ধরা হবে। সেই কারণেই সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে শিল্পমহল, সরকারি কর্মচারী এবং অর্থনীতিবিদদের নজর আজকের বাজেটের দিকে।
নতুন অর্থমন্ত্রীর সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ রাজ্যের বিপুল ঋণের বোঝা সামলানো। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, পূর্ববর্তী সরকারের আমলে রাজ্যের মোট ঋণের পরিমাণ প্রায় ৭.৮ লক্ষ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষে শুধুমাত্র ঋণ পরিশোধের জন্য প্রায় ৮২ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করতে হয়েছে, যার মধ্যে প্রায় ৪৯ হাজার কোটি টাকা শুধুমাত্র সুদ বাবদ খরচ হয়েছে। ফলে রাজ্যের আর্থিক পুনর্গঠন এবং আয় বৃদ্ধির পথ খুঁজে বের করাই এখন সরকারের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।
গত অর্থবর্ষে রাজ্যের নিজস্ব রাজস্ব আয়ের পরিমাণ ছিল প্রায় ১ লক্ষ ১২ হাজার ৫৪৩ কোটি টাকা। অর্থনীতিবিদদের মতে, এই আয়ের বড় অংশ ঋণ শোধে চলে যাওয়ায় উন্নয়নমূলক খাতে অতিরিক্ত ব্যয় করা কঠিন হয়ে পড়ে। তবে কেন্দ্রীয় করের ভাগ এবং বিভিন্ন অনুদান মিলিয়ে রাজ্যের মোট আয় আরও বৃদ্ধি পেয়েছিল। নতুন বাজেটে সেই আয়ের পরিমাণ আরও বাড়ানোর চেষ্টা করা হবে বলেই আশা করা হচ্ছে।
বাজেট প্রস্তুতির আগে অর্থমন্ত্রী দিল্লিতে গিয়ে কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামন এবং নীতি আয়োগের উপাধ্যক্ষ অশোক লাহিড়ীর সঙ্গে বৈঠক করেছেন। প্রশাসনিক সূত্রের মতে, কেন্দ্রীয় সহযোগিতা, বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের নানা বিষয় নিয়ে সেখানে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হয়েছে। সেই ভাবনার প্রতিফলনও আজকের বাজেটে দেখা যেতে পারে।
সম্প্রতি সংবাদমাধ্যমে অর্থমন্ত্রী রাজ্যের উন্নয়নের জন্য ‘মার্শাল প্ল্যান’-এর প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করেছিলেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপ পুনর্গঠনের জন্য যে বিশাল কর্মসূচি নেওয়া হয়েছিল, তার অনুপ্রেরণায় বাংলার অর্থনীতি ও পরিকাঠামোর পুনর্গঠনের লক্ষ্যেই এই মন্তব্য করা হয়েছে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা। ফলে সড়ক, সেতু, শিল্পাঞ্চল, পরিবহণ ও অন্যান্য অবকাঠামোগত খাতে বড়সড় ঘোষণা আসতে পারে বলে জল্পনা রয়েছে।
সরকারি কর্মচারীদের মধ্যেও বাজেট নিয়ে বিশেষ আগ্রহ রয়েছে। সম্প্রতি বিভিন্ন কর্মচারী সংগঠনের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠকে মুখ্যমন্ত্রী ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, মহার্ঘ ভাতা (ডিএ) সংক্রান্ত কিছু গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা বাজেটে থাকতে পারে। একই সঙ্গে শিল্প ও বাণিজ্য মহলও নতুন শিল্পনীতি, জমি সংক্রান্ত সংস্কার, বিনিয়োগে উৎসাহভাতা এবং স্ট্যাম্প ও রেজিস্ট্রেশন ফিতে সম্ভাব্য ছাড়ের দিকে নজর রাখছে।
সরকার ইতিমধ্যেই নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী কয়েকটি সামাজিক প্রকল্পে পরিবর্তন এনেছে। লক্ষ্মীর ভাণ্ডার প্রকল্পে অনুদানের পরিমাণ বৃদ্ধি এবং অন্নপূর্ণা যোজনার সূচনা তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য। তবে একদিকে ঋণের চাপ সামলে এবং অন্যদিকে কল্যাণমূলক প্রকল্প চালু রেখে কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ করা সরকারের কাছে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অর্থমন্ত্রী আগেই জানিয়েছেন, এই বাজেট মূলত চলতি অর্থবর্ষের বাকি আট মাসের জন্য প্রণয়ন করা হচ্ছে। ফলে সরকারের দীর্ঘমেয়াদি সমস্ত পরিকল্পনা এই বাজেটে উঠে না এলেও আগামী দিনের নীতিগত দিশা সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত মিলতে পারে। তাই রাজ্যের অর্থনীতি, উন্নয়ন এবং প্রশাসনিক কর্মসূচির ভবিষ্যৎ রূপরেখা জানতে আজকের বাজেটের দিকে তাকিয়ে রয়েছে গোটা বাংলা।



















