বিনোদন – বাংলা চলচ্চিত্র জগতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সংগঠন ইমপা বা ইস্টার্ন ইন্ডিয়া মোশন পিকচার্স অ্যাসোসিয়েশনের অন্দরমহলে ফের তীব্র বিতর্ক। আইপ্যাকের পর এবার ইমপাতেও ‘ফাইল রহস্য’ ঘিরে শুরু হয়েছে জোর চর্চা। কোথায় গেল গুরুত্বপূর্ণ ফাইল, তাতে এমন কী তথ্য ছিল— তা নিয়েই এখন সরগরম টলিপাড়া। বৃহস্পতিবার সাধারণ সভাকে কেন্দ্র করে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত কার্যত রণক্ষেত্রের চেহারা নেয় ইমপা অফিস। এমনকি ‘ফাইল চোর’ স্লোগানও উঠতে শোনা যায় পিয়া সেনগুপ্তকে ঘিরে।
২২ মে সাধারণ সভার ডাক দিয়েছিলেন ইমপা সভাপতি পিয়া সেনগুপ্ত। দুপুর থেকেই সংগঠনের অফিসে জড়ো হতে থাকেন প্রযোজক, পরিবেশক এবং চলচ্চিত্র জগতের বিভিন্ন সদস্যরা। উপস্থিত ছিলেন গোপাল মদনানি, এনা সাহা, অনুপ সেনগুপ্ত, সমীরণ দাস-সহ একাধিক সদস্য। অন্যদিকে বিরোধীপক্ষের হয়ে হাজির ছিলেন শতদীপ সাহা, রতন সাহা, মিলন ভৌমিক এবং কৃষ্ণ দাগা।
তবে বৈঠক শুরুর আগেই উত্তপ্ত হয়ে ওঠে পরিস্থিতি। পিয়া সেনগুপ্তর অভিযোগ, বৈধ সদস্য নন এমন কয়েকজনও সভায় ঢুকে পড়েন এবং তাঁর সঙ্গে দুর্ব্যবহার করা হয়। পিয়ার দাবি, “আমার সঙ্গে অভব্য আচরণ করা হয়েছে। এমনকি তেড়ে আসাও হয়েছে। আমি প্রশাসনের কাছে যাব। অনেক সহ্য করেছি, আর নয়।”
রাজ্যে রাজনৈতিক পালাবদলের পর থেকেই ইমপা-র অন্দরে চাপা উত্তেজনা বাড়তে থাকে। একাংশ প্রযোজক ও পরিবেশকের অভিযোগ ছিল, সংগঠনটি দীর্ঘদিন ধরে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক প্রভাববলয়ে পরিচালিত হয়েছে। সেই সময় থেকেই পিয়া সেনগুপ্তর পদত্যাগের দাবি তুলতে শুরু করেন বিরোধী শিবিরের সদস্যরা। তাঁদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন শতদীপ সাহা।
নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর ইমপা অফিসে ‘গঙ্গাজল ছিটিয়ে শুদ্ধিকরণ’-এর ঘটনাও শিরোনামে আসে। সেই ঘটনার পর থেকেই সংঘাত আরও প্রকট হয়ে ওঠে। পিয়া সেনগুপ্তর বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগও ওঠে। পাশাপাশি প্রাক্তন ফেডারেশন সভাপতি স্বরূপ বিশ্বাসের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতা নিয়েও প্রশ্ন তোলে বিরোধীপক্ষ। যদিও পিয়া বরাবরই সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
বৃহস্পতিবারের উত্তপ্ত পরিস্থিতির মধ্যেই নিজের অবস্থান স্পষ্ট করে পিয়া প্রশ্ন তোলেন, “আমি কী সুবিধা নিয়েছি, আমায় জানানো হোক।” তাঁর অভিযোগ, পরিকল্পিতভাবে তাঁকে চাপে ফেলার এবং অপমান করার চেষ্টা করা হচ্ছে।
অন্যদিকে বিরোধীপক্ষের দাবি, তাঁরা শুধুমাত্র স্বচ্ছতা এবং নতুন নির্বাচনের দাবিই তুলেছেন। শতদীপ সাহার অভিযোগ, সাধারণ সভার আলোচনার নথি বা মিনিটস অফ মিটিং (MOM) লিখে রাখার অনুরোধ করা হলেও ইমপা সম্পাদক আশিস বন্দ্যোপাধ্যায় তা করতে অস্বীকার করেন। তাঁর দাবি, সদস্যরা মিটিং ছেড়ে বেরিয়ে এলেও সম্পাদককে আটকে রাখা হয়। যদিও বিষয়টি নিয়ে পাল্টা মতও সামনে এসেছে।
দিনের শেষে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে একটি গুরুত্বপূর্ণ ফাইলকে কেন্দ্র করে। সন্ধ্যার পর থেকেই শুরু হয় ফাইল গায়েব হয়ে যাওয়ার অভিযোগ। কে সেই ফাইল সরাল এবং তাতে কী তথ্য ছিল, তা নিয়েই শুরু হয়েছে নতুন বিতর্ক। ইমপা অফিসের ভিতরে ‘ফাইল চোর’ স্লোগানও উঠতে শোনা যায়।
পিয়া সেনগুপ্তর দাবি, গুরুত্বপূর্ণ ওই ফাইল বিরোধীপক্ষের সদস্যরাই আটকে রেখেছিলেন। যদিও বিরোধীপক্ষ সেই অভিযোগ অস্বীকার করেছে। পিয়ার বক্তব্য, “আপনারা তো ছিলেন, আমার হাতে কোনও ফাইল দেখেছেন কি?”
ক্রমশ উত্তেজনা বাড়তে থাকায় পরিস্থিতি সামাল দিতে পুলিশকে হস্তক্ষেপ করতে হয়। পরে ইমপা সম্পাদক আশিস বন্দ্যোপাধ্যায় এবং পিয়া সেনগুপ্ত— দু’জনকেই সেখান থেকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। আশিস বন্দ্যোপাধ্যায় শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যায় অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন বলে জানা গিয়েছে। অন্যদিকে পিয়াও শারীরিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েন।
এদিকে বিরোধীপক্ষ দাবি করেছে, খুব শিগগিরই নতুন নির্বাচন করা হবে। ততদিনের জন্য অস্থায়ী সভাপতি হিসেবে রতন সাহার নামও ঘোষণা করা হয়েছে। তবে এই সিদ্ধান্ত সাংগঠনিকভাবে কতটা বৈধ, তা নিয়েও ইতিমধ্যেই প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।
সব মিলিয়ে ইমপা-র অন্দরের এই সংঘাত এখন টলিউডের অন্যতম বড় আলোচনার বিষয়। আগামী দিনে এই বিরোধ কোন দিকে মোড় নেয়, সেদিকেই নজর ইন্ডাস্ট্রির।




















